পৃথিবীর জলবায়ু দিন দিন অস্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি মানবসভ্যতার জন্য বিরাট হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সামনের বছরগুলোতে আমরা হয় সেই হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকব, অথবা পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে অভ্যস্ত হতে বাধ্য হব। আমাদের গৃহীত ব্যবস্থাই আসন্ন দশকগুলোর অবস্থা নির্ধারণ করবে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বদ্বীপ হলো বাংলাদেশ। নদীমাতৃক দেশ হিসেবেও বাংলাদেশ সুপরিচিত। ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে আন্দাজ করা যায় যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে ভয়ংকর ক্ষতির মুখে পড়তে হবে এই দেশকে।
অরিয়ন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের এক তথ্যমতে জানা যায় যে, বাংলাদেশের মোট শহুরে জনসংখ্যার ১২ শতাংশেরও বেশি মানুষ শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছে। শহরের আকাশে-বাতাসে মিশে রয়েছে পরিবহন ও কলকারখানার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক তো বটেই, সেই সঙ্গে শহরে বসবাসরত মানুষদের স্বাস্থ্যের জন্যও হুমকির কারণ। দেশের জলবায়ু পরিবর্তনে অন্যতম ভূমিকা রাখছে এই ধোঁয়া, যার ফলে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও মানুষের সুস্বাস্থ্য উভয়ই সংকটাপন্ন। আর তাই দেশকে পরিচ্ছন্নতার পথে নিয়ে যেতে হলে সেই পথের সবচেয়ে বড় ঝঞ্ঝাটটিকে নির্মূল করতে হবে সবার আগে।
২০০৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত রাজধানীর সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে ১৩৫ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১২ সালে বায়ুদূষণের মূল কারণ ছিল ইটের ভাটা এবং যানবাহনের কালো ধোঁয়া ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল বাণিজ্যিক পরিবহন এবং পরিবহনগুলোর যথাযথ পরিচর্যার কমতিই ছিল এমন বায়ুদূষণের কারণ। মূলত পেট্রোল, ডিজেলের মতো জ্বালানি পুড়ে নির্গত হয় কালো ধোঁয়া, যা কার্বন ডাইঅক্সাইডের রূপ নিয়ে বাতাসে মিশে গিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। যদিও এই সমস্যা নিরসনে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক, যানবাহন থেকে মাত্রাতিরিক্ত কালো ধোঁয়া নির্গমন ঠেকাতে বেশ কিছু নীতিমালা নির্ধারিত রয়েছে, তার পরও এই সমস্যা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
২০১২-এর তথ্য মোতাবেক পরিবহনের কালো ধোঁয়ার কারণে বায়ুদূষণের বিষয়টি বিবেচনা করে পরিবেশ অধিদপ্তর ডিজেল, পেট্রোল ও সিএনজিচালিত যানবাহনের জন্য পৃথক পৃথক নির্গমন নীতিমালা ঘোষণা করেছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, বিশেষজ্ঞদের মতে ইঞ্জিনের মান এবং জ্বালানিই পারে একটি পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। বাংলাদেশকে পুরুজ্জীবিত করে তুলতে সরকার এবং নীতিনির্ধারকদের প্রয়োজন গৃহীত নীতিমালা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে মজবুতকরণের মাধ্যমে সব রকম দূষণ রোধে জোরদারি বাড়ানো। বাণিজ্যিক অথবা সাধারণ পরিবহনগুলো বর্তমানে ইউরোপ এবং প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আমদানিকৃত বিএস-১, বিএস-২, ইউরো-১, ইউরো-২ জ্বালানি ব্যবহার করছে, যেখানে ঐ দেশগুলো নিজেদের দেশের পরিবহনগুলোতে ব্যবহার করছে বিএস-৩, বিএস-৪, ইউরো-৩, ইউরো-৪-এর মতো পরিবেশবান্ধব জ্বালানি। কিন্তু বিএস-১ ও ইউরো-১ থেকে সরাসরি বিএস-৪ ও ইউরো-৪-এ রূপান্তরিত করাটি অযৌক্তিক। হঠাত্ই কোনো নির্মূল প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে অজৈবিক একটি ইকোসিস্টেম ব্যাহত করার পরিবর্তে বিশ্বব্যাপী বিএস-৪ ও ইউরো-৪-এর ব্যবহারকে প্রথমে গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। বিএস-৪ ইউরো-৪-এ সালফারের পরিমাণ বিএস-১, বিএস-২, ইউরো-১, ইউরো-২-এর থেকে অনেকাংশেই তুলনামূলক কম। সালফার ডিজেল ইঞ্জিনের ইনজেক্টরে লুব্রিক্যান্টের কাজ করে, যার ফলে স্বল্প পরিমাণের সালফার টিকে থাকবে দীর্ঘ সময় ধরে। পাশাপাশি ইঞ্জিনও নিরাপদে লাখো কিলোমিটার চলাচল করতে পারবে কোনো বাড়তি রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই। এছাড়া পেট্রোল জ্বালানিযুক্ত ইঞ্জিন এবং তার থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া হ্রাসে ব্যবহূত প্রযুক্তি থেকে জানা যায় যে, প্রতি মিলিয়নে ৫০ পার্টের থেকে কম পরিমাণে সালফার ধারণকৃত জ্বালানি ব্যবহারে বাড়তি সুবিধা থাকারও সম্ভাবনা রয়েছে। পেট্রোল, ডিজেলে যথাযথ সালফারের উপস্থিতি এবং পরিবেশবান্ধব নির্গমনে নাইট্রোজেন অক্সাইড, পার্টিকুলেট ম্যাটার এবং কার্বন ডাইঅক্সাইডের অবদানকে ঘিরে হয়েছে অনেক আলোচনা। সুতরাং ৫০ পিপিএমের চেয়ে কম সালফারযুক্ত জ্বালানি আমদানিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দেশের প্রধান শহরগুলোতে পরিবহন নির্গমনের হার অনেকাংশেই হ্রাস পাবে এবং পরিবহনজনিত হুমকিগুলো প্রতিরোধ করে একটি সুস্থ পরিবেশ গড়ে তুলতে দেশ সক্ষম হবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ‘সিসিএসি’-এর একটি সদস্য প্রতিষ্ঠাতা দেশ এবং ২০১২ থেকে বাংলাদেশ লক্ষণীয়ভাবে ইটের ভাটাজনিত দূষণ রোধে কাজ করে আসছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, যথাযথ মানের ইঞ্জিন ও জ্বালানি আমদানিকরণ নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশে বিদ্যমান দূষণের হার কমিয়ে এনে দেশকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলা সম্ভব এবং সেই সাফল্য অর্জন করা গেলে সেটি হবে বাংলাদেশের পরবর্তী ৫০ বছরের জন্য উন্নয়নের নতুন সূচনা।
n লেখক :ফ্রিল্যান্সার