‘নাটক বাজে দিকে চলে যাচ্ছে’

পেশাগতভাবে কর্পোরেট ইন্ডাস্ট্রিতে ক্যারিয়ার শুরু করলেও মুকিত জাকারিয়াকে এখন বাঙালিরা চেনেন প্রিয় মডেল বা অভিনেতা হিসেবে। নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর হাত ধরে মডেল হিসেবে পরিচিতি, এরপর নিজ নিষ্ঠায় আজ অভিনেতা হিসেবে জনপ্রিয় এক তারকা। কথা বলেছেন বিভিন্ন প্রসঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এ এম রুবেল

বর্তমান কাজ প্রসঙ্গে জানতে চাই—

একটা ওয়েব সিরিজের কাজ শেষ করলাম। আমি তো সময় নিয়ে কাজ করি। তাই সামনের ঈদের কাজ শুরু শিগগিরই শুরু করবো।

ঈদে রেকর্ডসংখ্যক নাটকে কাজ করেছেন। প্রতিক্রিয়া কেমন পেলেন?

এবারের ঈদে প্রচার হয়েছে আমার ৩০টি একক ও ৭টি ধারাবাহিক নাটক। প্রতি ঈদে চ্যানেলগুলোতে প্রায় সাড়ে ৭শ’ নাটক প্রচার হয়। এত নাটকের ভিড়ে ভালো নাটক আসলে সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারছে না। তবে আমার ‘সেফালির প্রেমিকারা’ নাটকটিতে প্রচুর সাড়া পেয়েছি।

একটি নাটক জনপ্রিয় হলেই সেটা কপি করার প্রবণতা লক্ষ্য যায়। এ নিয়ে কী বলবেন?

হ্যাঁ, এই বিষয়টি কিন্তু অনেকটাই সত্য। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে এটা কেন করতে হবে! আমরা তো নতুন গল্প তুলে ধরতেই পারি। আমাদের গল্পের তো অভাব নেই। আমার মনে হয় এই বিষয়টির পরিবর্তন দরকার।

প্রতি ঈদেই অসংখ্য নাটক তৈরি হয়। কিন্তু কোনো নাটকই সেভাবে সাড়া না ফেলার কারণ কী?

এখন আকাশ সংস্কৃতির কারণে দর্শক নানা দিকে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। আপনি ঘরে বসেই কোরিয়ান, হলিউড বা বলিউডের ছবি দেখে তারপর কিন্তু একটি নাটক দেখবেন না। তাছাড়া মাত্র ১৫-১৬টি চ্যানেলে এতগুলো নাটক একসঙ্গে কেন প্রচার করতে হবে! এত নাটকের ভিড়ে দর্শক কোনটা দেখবে? এক সময় টিভি কম ছিল, মানুষ একটি নাটক মন দিয়ে দেখতো। এখন কিন্তু সেটা করছে না।

একসঙ্গে এত কাজ করলে মান রক্ষা বা ধারাবাহিকতায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় বলে মনে করেন না?

আমি ঈদকে সামনে রেখে দুই মাসে এত কাজ করিনি। ৬-৭ মাস যাবত্ কাজগুলো করেছিলাম। কারণ আজ একটি নাটকে যে চরিত্রে কাজ করছি, কাল কিন্তু অন্য চরিত্রে কাজ করবো। একটি চরিত্র থেকে অন্য একটি চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নিতে সময় দরকার হয়। সেই চিন্তাটা আমার মাথায় থাকে।

তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকা কতটা চ্যালেঞ্জের বলে মনে হয়?

সত্যিই বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটা খুবই চ্যালেঞ্জের একটি বিষয়। তবে আমাকে তরুণ প্রজন্মের সকলেই বেশ সহযোগিতা করে। আর পুরনোদের ভেতরে তৌকীর ভাই, জাহিদ হাসান ভাই, চঞ্চল ভাই ও মোশাররফ ভাইয়ের কথা সারাজীবন মনে থাকবে। এছাড়া আজকের আমাকে মুকিত জাকারিয়া বানানোর কারিগর মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং সাংবাদিক ভাইদের কাছে সত্যি আমি সারাজীবনের জন্য কৃতজ্ঞ।

এখনকার নাটক ও ওয়েব সিরিজে অশ্লীল দৃশ্য বা সংলাপ ব্যবহারকে অবক্ষয়, নাকি সময়ের ধারাবাহিকতা বলবেন?

ভালো গল্পে নাটক বা ওয়েব সিরিজ নির্মিত হলে যে দর্শকরা দেখে না সেটা কিন্তু না। ভালো সংলাপ, গল্প দিয়ে অনেকেই জনপ্রিয় হয়ে হয়েছেন এবং টিকে আছেন। কিন্তু যারা এই সস্তা বাণিজ্যে নিজেকে ভাসাচ্ছেন তাদের ক’জন চেনে। আর একটা সময় কিন্তু তারা ঝরে পড়ছেই।

এখন ভিউ গুনে নাটক ও শিল্পীর মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এ নিয়ে কী বলবেন?

ভিউ গুণে সাময়িক জনপ্রিয় হওয়া যায়, স্থায়ী হওয়া যায় না। অনেক খারাপ কন্টেন্টেরও অনেক ভিউ হয়। এটা কিন্তু বিচার্য না।

এখন শিল্পী থেকে শুরু করে নির্মাতারা নিজেস্ব ঘরানার বাইরে কাজ করতে চান না। এটা নতুন শিল্পী তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে না?

নিশ্চয় নতুন শিল্পীর তৈরির ক্ষেত্রে এই চর্চা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ধরনের মানসিকতা থেকে বের না হলে আমাদের সংস্কৃতি অনেক পিছিয়ে পড়বে। তবে একটা শ্রেণির শিল্পী-নির্মাতা এই কাজটি করছেন। নিজেস্ব ঘরানার বাইরে গিয়ে অনেক নির্মাতাই কিন্তু নাটক, সিনেমা নির্মাণ করে সফল হয়েছেন। এখন শিল্পী তৈরির সেই কারিগররা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন।

স্ক্রিপ্ট ছাড়া নির্মাণের চর্চা অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। অনেক নির্মাতাই এ পথে হাঁটছেন। বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আমি এ ধরনের চর্চা থেকে দূরে থাকি। আমি কাজ করার আগে স্ক্রিপ্ট আগে চাই।

নাটককে চরিত্র সংকট বেড়েই চলছে। এতে একটি ভালো গল্প রূপায়ণ করা কতটা সম্ভব হচ্ছে বলে মনে করেন?

অবশ্যই একারণে ভালো গল্প তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। আগে একটি নাটকে পুরো একটি পরিবারকে দেখানো হতো। গল্পটি সাবলীলভাবে তুলে ধরা হতো। কিন্তু দেখেন এবার ঈদে সাড়ে ৭শ’ নাটক প্রচারেরও পরও একটি নাটক মানুষের মুখে মুখে প্রচার হচ্ছে না।

এখন টিভি নাটকের দর্শক নানা মাধ্যমে পরিবর্তিত হচ্ছে। এতে আমাদের টিভি নাটক কোনদিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন?

টিভি নাটক বাজে দিকে চলে যাচ্ছে। এখন কিশোরদের কাছে স্মার্ট ফোন আসায় টিকটকসহ নানা ধরনের কন্টেন্ট অশালীনভাবে তৈরি করা হচ্ছে। একটা শ্রেণির মানুষ সেটা দেখছেও। অনেক মানহীন নাটকও প্রচার হচ্ছে নতুন মাধ্যমগুলোতে। আমার মনে হয়, এই অবস্থা থেকে উত্তরণে একটা নীতিমালার ভেতরে থাকতে হবে।

অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়া আমাদের প্রেক্ষাপটে কতটা ইতিবাচক মনে করেন?

অভিনয়কে মিস ইউজ না করলে পেশা হিসেবে নেওয়া যায়। শেষ বয়সে যেন দুঃস্থ শব্দ যোগ না হয় সেই বিষয়টির দিকে লক্ষ্য রেখে কাজ করতে হবে।  পাশাপাশি সরকারের একটু দৃষ্টি আমাদের দিকে দিতে হবে। তার সফর সঙ্গী থেকে শুরু করে আমাদের আনুষাঙ্গিক বিষয়গুলোতে সরকারের একটু নজর দেওয়া দরকার বলে আমি মনে করি।