গাজায় যুদ্ধবিরতি, আল-আকসায় ফের সংঘাত

১১ দিন যুদ্ধের পর ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে ২৫০ জন। যাদের বেশির ভাগ মারা গেছেন গাজায়। ইসরাইল এবং হামাস দুই পক্ষই দাবি করেছে, এই যুদ্ধে তাদের বিজয় হয়েছে। গতকাল ধ্বংসস্তূপ থেকে ৯ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে গতকাল জুমার নামাজের পর আল-আকসা মসজিদ এলাকা থেকে দাঙ্গার খবর পাওয়া গেছে। খবর বিবিসির

যুদ্ধবিরতি কার্যকর

ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী           আইডিএফ জানিয়েছে, গাজায় ১১ দিনের লড়াইয়ে তারা ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস এবং ইসলামিক জিহাদের ২৫ জন ঊর্ধ্বতন কমান্ডার ও ২০০-এর মতো সক্রিয় সদস্যকে হত্যা করেছে। তবে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজায় ২৪৩ জন মারা গেছে, যার মধ্যে ৬৬ জন শিশু এবং ৩৯ জন নারী। হামাস তাদের যোদ্ধাদের হতাহতের কোনো পরিসংখ্যান দেয়নি।

বিজয় দাবি ইসরাইল-হামাসের

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাদের সামরিক অভিযান অভূতপূর্ব সফল দাবি করে বলেছেন, তারা বিমান হামলা চালিয়ে হামাসের ১০০ কিলোমিটার বিস্তৃত সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বিধ্বস্ত করে দিয়েছে এবং ইসরাইলের শহর লক্ষ্য করে হামাসের রকেট নিক্ষেপের ক্ষমতা নষ্ট করে দিয়েছে। আইডিএফ দাবি করেছে, হামাসের সামরিক শাখা যেসব বহুতল ভবন থেকে তাদের কর্মকাণ্ড চালাত এরকম ৯টি ভবন, গাজায় হামাসের ১০টি সরকারি দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১১টি শাখা অফিস এবং পাঁচটি ব্যাংকে তারা বোমাবর্ষণ করেছে। তারা আরো দাবি করেছে, তাদের আয়রণ ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামাসের ছোড়া ৯০ শতাংশ রকেট ভূপাতিত করে বিধ্বস্ত করেছে।

হামাসের একজন শীর্ষ নেতা বিবিসিকে বলেছেন যে, ইসরাইল শেখ জারা এবং আল-আকসা মসজিদ থেকে সরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মুসলিমদের জন্য অন্যতম সবচেয়ে পবিত্র একটি মসজিদ আল-আকসা। জেরুজালেমের এই শেখ জারা এলাকায় ফিলিস্তিনি কয়েকটি পরিবারকে তাদের বাড়ি থেকে উত্খাত করাকে কেন্দ্র করেই এবারের সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল। তবে এরকম কোনো প্রতিশ্রুতি বা সমঝোতার কথা ইসরাইল অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, তাদের যুদ্ধবিরতি কোনো শর্তসাপেক্ষে হয়নি।

হামাসের একজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, ইসরাইলের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য একটা বিজয়। এই বিজয়ের আনন্দ দেখা গেছে পুরো গাজা জুড়ে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর রাস্তায় নেমে এসে আনন্দ-উল্লাস করেছে গাজার জনগণ। ‘আজ বিজয়ের দিন, স্বাধীনতার দিন, আমাদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের একটা দিন’, বলেছেন একজন ফিলিস্তিনি। লেবাননের শিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ফিলিস্তিনিদের বীরের মতো লড়াই করার প্রশংসা করেছে। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ (ইসরাইলের সঙ্গে) লড়াইয়ে নতুন মোড় তৈরি করেছে।

সংশয়, সতর্কবার্তা

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক হামাস কাউন্সিলের সদস্য বাসেম নাঈম বিবিসিকে বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে কি না তা নিয়ে তার সংশয় রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি ন্যায়বিচার এবং ইসরাইলের আগ্রাসন ও নৃশংসতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এর স্থায়িত্ব নিয়ে তিনি সন্দিহান। হামাসের রাজনৈতিক শাখার সদস্য ইজ্জাত আল-রেশিক ইসরাইলের প্রতি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আজ যুদ্ধ থেমেছে সেটা ঠিক, কিন্তু নেতানিয়াহু এবং সারা বিশ্বের জানা উচিত যে আমাদের আঙুল ট্রিগারে রাখাই আছে এবং প্রতিরোধের প্রয়োজনে তার গতি বাড়ানো অব্যাহত থাকবে।

আল-আকসায় আবার সংঘাত

জেরুজালেমের পুরোনো শহর এলাকায় জুমার নামাজের পর আল-আকসা মসজিদ চত্বরে ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী ও ইসরাইলি পুলিশের মধ্যে আবার সংঘর্ষ হয়েছে। ইসরাইলি পুলিশ বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই দাঙ্গা বাঁধে। বিবৃতিতে বলা হয়, কাছের এক ফটকের কাছে পুলিশ অফিসারদের লক্ষ্য করে কয়েকশ তরুণ পাথর এবং মলোটভ ককটেল ছুঁড়তে শুরু করে। জেরুজালেমের পুলিশ কমান্ডার দাঙ্গাকারীদের ঠেকাতে পুলিশ অফিসারদের ভেতরে ঢোকার নির্দেশ দিয়েছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, পুলিশ অফিসাররা স্টান গ্রেনেড এবং কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়েছে।

বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, তার প্রশাসন ফিলিস্তিনে মানবিক সাহায্য পৌঁছে দেবে। তিনি বলেন, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মানুষের নিরাপদে জীবনযাপনের সমান অধিকার আছে। সমান স্বাধীনতা আছে। এটাই সুযোগ, উন্নতির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব টুইট করে বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি যাতে দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেজন্য সব পক্ষকে কাজ করতে হবে। সহিংসতা এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। এই সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। যুক্তরাজ্য শান্তির জন্য যে কোনো উদ্যোগকে সমর্থন করবে।

মিশরের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে। তাই মিশরকে ধন্যবাদ দিয়েছেন বাইডেন। তারপরই মিশরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফতাহ আল-সিসি বলেছেন, যুদ্ধবিরতির পিছনে বাইডেনের অবদান প্রচুর। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ১১ দিনের মারাত্মক সংঘাত শেষের ঘোষণাকে তিনি স্বাগত জানাচ্ছেন। গুতেরেস বলেছেন, ‘এই সংঘাত কেন হলো, তার মূল কারণ খুঁজতে হবে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনকে। তাদের আলোচনা শুরু করতে হবে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশি বলেছেন, সবার যুদ্ধবিরতির জন্য চেষ্টা করেছিলেন। এটা হলো সেই সম্মিলিত শক্তির ফল। তবে এটা ফিলিস্তিনে শান্তি আসার ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ।