বিজ্ঞানীদের নিগ্রহ

মাধব রায়

সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)

ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট

গতকালের পর

 

হ্যাঁ, আরও ঘটনা আছে। বললেন নীলকান্তবাবু। নৌবাহিনির ডাক্তার রবার্ট মেয়ার জাহাজের অসুস্থ নাবিকদের চিকিত্সা করতে গিয়ে দেখতে পান গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে এলে পরে মৃদু আবহাওয়ায় বসবাসকারী ইউরোপিয় নাগরিকদের চেয়ে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ইউরোপিয় নাবিকদের শিরা ও ধমনীর রক্তের রঙের পার্থক্য কম হয়। ডাক্তার চিন্তিত হলেন-এটি কী করে ঘটে। পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন, গ্রীষ্মমণ্ডলের নাবিকদের দেহের নিজস্ব তাপ উত্পাদনের প্রয়োজন পড়ে কম। ফলে দহন ক্রিয়ার মাত্রা কম থাকে এবং অক্সিজেনের ব্যবহারও কম। ফলে রক্তের রং লাল। তিনি ভাবলেন-কাজ করলে তাপের বৃদ্ধি ঘটে। বিষয়টি নিয়ে তিনি পরে গবেষণা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন কাজ ও তাপ পরস্পরের সমানুপাতিক। ১৮৪১ সালে রবার্ট মেয়ার বিবৃতি দিয়ে বলেন এটি হচ্ছে তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র। কিন্তু তার আবিষ্কার অনেককে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল।

ধর্মান্ধ-মূর্খ মানুষদের? বলল আকাশ।

না, না, বাধা দিলেন নীলকান্তবাবু। রীতিমতো লেখাপড়া জানা জ্ঞানী-বিজ্ঞানী মহলকেই ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। সামান্য ডাক্তার, লেখাপড়া নিতান্তই সামান্য, অধ্যাপক পদবাচ্যেও ভূষিত নয়, সে কি না সমস্ত শিক্ষিত মানুষকে পেছনে ফেলে একটা তত্ত্ব দাঁড় করিয়ে দিল! বিজ্ঞানীরা রবার্ট মেয়ারের সমালোচনা করতে থাকলেন এবং নোংরামিতেও পিছিয়ে থাকলেন না।

নোংরামি! অবাক হলো সবাই।

মেয়ারকে পাগল বলে প্রচার করতে থাকলেন এবং তাঁকে পাগলা গারদে পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন। তাঁর সূত্রকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিলেন।

এই দলে কে কে ছিলেন? বলল অণু।

পাগল ক্ষেপানোর এই দলে হেলমহোলত্স, রুডলফ ক্লসিয়াস এর মতো নামিদামি বিজ্ঞানীরাও ছিলেন।

ক্লসিয়াস! এই যে ক্লসিয়াসের সূত্র তিনি? আকাশ অবাক হয়ে বলল।

হ্যাঁ, তিনি।

পরে কী হলো? রেখা বলল।

পরে ইংরেজি পদার্থবিদ জন টিনভ্যাল ১৮৫২ সালে রয়্যাল সোসাইটির সভায় রবার্ট মেয়ারের পক্ষ সমর্থন করে বিবৃতি দেয়ায় সবার ভুল ভাঙে এবং মেয়ারকে তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্রের জনকরূপে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

যাক, শেষপর্যন্ত তিনি টিকে গেলেন। বিন্দু বলল।

নীলকান্তবাবু বলতে লাগলেন, টমাস আলভা এডিসনের ক্ষেত্রেও এরকম ঘটনা ঘটেছে। ১১ মার্চ ১৮৭৮ প্যারিসের বিজ্ঞান একাডেমির সভায় এডিসন তাঁর তৈরি টিনের চোঙ্গায় প্রথম কলের গান বাজিয়ে শোনাচ্ছেন।

কলের গান, মানে আমরা যে সিডি, প্যানড্রাইভে গান শুনি? বলল রেখা।

হ্যাঁ, তখন তো আর সিডি ভিসিডি ছিল না, কলের গান ছিল। আমরাও দেখেছি। বললেন নীলকান্তবাবু-তাঁকে সহায়তা করছেন পদার্থবিদ দ্যু মোসে। মানুষের কণ্ঠস্বর কানে যেতেই বিজ্ঞান একাডেমির সদস্য বুলাউদ রেগে উঠলেন। বললেন-এ তো ধাপ্পাবাজি। চালাকি করে একটা মায়াস্বর শুনিয়েছেন বলে কি আমরা এডিসনকে শিরোপা দেব!

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এর আগেই ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৮ এডিসনের কলের গান আমেরিকায় পেটেন্ট পেয়ে গিয়েছিল। বুলাউদ তা জানতেনই না। আচ্ছা তোমরা কি জান, মৌলিক পদার্থ কয়টি?

১১৮ টি, বলল সীমা। এ তো সবাই জানে। অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, সোনা, রূপা, তামা, পারদ বলতে লাগল সে।

আর বাতাস, পানি, আগুন? প্রশ্ন করলেন নীলকান্তবাবু।

এগুলো তো যৌগিক পদার্থ।

কিন্তু অতীতে মাটি, পানি, অগ্নি, বায়ুকে মৌলিক পদার্থ হিসেবে গণ্য করা হতো। ১৭৮৯ সালে ল্যাভয়সিয়ে ‘এলিমেন্টারি ট্রিটিজ অন ক্যামিস্ট্রি’ বইতে মাটি, পানি, বায়ু, আগুনকে মৌলিক পদার্থের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেন। বেঁকে বসলেন আতোঁয়া ব্যোমে নামক একজন বিজ্ঞানী। ব্যোমে আবার হাইড্রোমিটার আবিষ্কার করেছিলেন। বিজ্ঞান পরিষদের সভায় তিনি বলেন-সর্বকালের পদার্থবিজ্ঞানীরা, এমনকি অ্যারিস্টটল পর্যন্ত বলেছেন এগুলো মৌলিক পদার্থ। দুই হাজার বছর ধরে পরিচিত সব মৌলিক পদার্থগুলো আজ যৌগিক পদার্থ হয়ে যাবে? অসম্ভব। আজ যদি মাটি, পানি, অগ্নি, বায়ু আর মৌলিক পদার্থ না থাকে, তাহলে এতদিনের শিক্ষা বিফল।

ফরাসি বিপ্লব শুরু হলে গোঁড়া বিপ্লবীরা ১৭৯৩ সালে সায়েন্স একাডেমি বন্ধ করে দেয় এবং ১৭৯৪ সালে সরকারকে সহযোগিতা করার অপরাধে ল্যাভয়সিয়ের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। এই বছর ৮ মে গিলোটিনের ধারালো ব­্যাড দ্বারা তাঁর মস্তক বিচ্ছিন্ন করা হয়। ১৭৯৫ সালে আবার ফরাসি সরকার তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করে।

মৃত্যুর পর নির্দোষ!

হ্যাঁ, যে ক্ষতি হবার তা তো হয়েই গেছে। ফরাসিরা এই ঘটনায় এখনও অনুতপ্ত। বিজ্ঞানীদের হত্যা করার আরও ঘটনা আছে। খ্রিষ্ট জন্মের ৫০০ বছর আগে পিথাগোরাস, এনাকু, সিমেন্ডসহ অন্যান্য গ্রিক পণ্ডিতগণ বলেছিলেন-পৃথিবী সূর্যের একটি গ্রহ এবং এটি সূর্যকে ঘিরে অন্য গ্রহগুলোর মতো ঘুরছে।

ধর্মান্ধ সমাজপতিরা এই কথাকে ধর্মবিরোধী, ঈশ্বরবিরোধী নাস্তিকতা বলে উড়িয়ে দিয়েছিল এবং পণ্ডিতদের নির্যাতন করতেও পিছপা হয়নি। পরবর্তীতে প্রায় দুই হাজার বত্সর পর পোল্যান্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বকে পুস্তকাকারে প্রচার করেন। এই পুস্তক তেমন একটা প্রচার পায়নি। এরপর ইতালির জ্যোতির্বিদ জিওর্দানো ব্রুনো এই তত্ত্বকে জোরেসোরে প্রচার করতে এগিয়ে এলেন। এতে ধর্মীয় গুরুরা খুব বিরক্ত হলেন। মহামান্য পোপ, ধর্মযাজক এবং ধর্মান্ধ সাধারণ মানুষজন একে ঈশ্বর বিরোধিতা বলে মন্তব্য করলেন। চরম শাস্তি নেমে এলো ব্রুনোর ওপর। তাঁকে এমন একটা ঘরে আটকে রাখা হলো যার ছাদ সীসায় মোড়ানো। ফলে গ্রীষ্মের রোদে ঘর আগুনের মতো গরম, আর শীতের ঠাণ্ডায় বরফের মতো শীতল হয়ে যেত।

                পরের অংশ আগামীকাল