সন্ধ্যার পর রাস্তায় হাঁটলে শুধু গুনগুন শব্দ আসতো পড়াশোনার

স্কুলে আমি

গাজী সালেহ উদ্দিন

সমাজ বিজ্ঞানী ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক

সাবেক অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

পাঞ্জাবীলেনের পাহাড়তলী গার্লস স্কুল, স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সালেহা চৌধুরী আমার বন্ধু কামালের মা । আমার মা একদিন নিয়ে ভর্তি করে দিলেন স্কুলে, সম্ভবত ১৯৫৪-৫৫!   কিন্তু আমার কোন আগ্রহ ছিল না, এটি মেয়েদের স্কুল বলে কিনা জানি না তবে মা যতক্ষণ থাকতেন ততক্ষণ থাকতাম তারপর মায়ের সাথে বাসায় চলে আসতাম। আমার কান্নাকাটিতে মহাবিরক্ত হয়ে স্কুল ছাড়িয়ে আনলেন আমার নাম দিলেন লেবা অর্থাত্ বোকা। এর দ্বারা লেখাপড়া হবে না সে ঘরে থাকুক। লেখাপড়ার প্রতি অনিহা ছিল খেলাধুলা করতে ভালোবাসতাম বেশি। ঘুড়ি ওড়ানো মার্বেল খেলা, ডাণ্ডাগুলি, লাট্টু, চোর পুলিশ।  কিন্তু বিপদ কাটেনি আমার বাবা ছোট ভাই গাজী শামছু উদ্দিন ও আমাকে  পাহাড়তলী পি,ই, রেলওয়ে স্কুলে ১ম (শিশু শ্রেণি) ভর্তি করিয়ে দিলেন। সেই লেখাপড়া শুরু।  দুভাই একই  ক্লাসে পড়তাম, ক্লাস নাইন পর্যন্ত একসেট বই, কারণ বাবার আর্থিক ক্ষমতা ছিল না। সাত ভাই এক বোন, তারপর দেখেছি বাবার আত্মমর্যাদা। ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন স্কুলে পুওর ফান্ডের জন্য আবেদনপত্র আহ্বান  করছিলো। পারিবারিক আর্থিক অবস্থা বুঝে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম পুওর ফান্ডের জন্য আবেদন করবো কিনা? বাবা আমাকে উত্তর দিয়েছিলেন ‘তুই হইর নি’ (তুই ফকির নাকি) কিন্তু আশির দশকে আমি পাহাড়তলী গার্লস স্কুলের ভাইস প্রেসিডেন্ট  থাকা অবস্থায় দেখেছি অনেক ছাত্রী অবস্থাপন্ন পরিবারের নিজস্ব গাড়িতে করে স্কুলে  আসা যাওয়া করে তাদের অভিভাবকরা ও পুওর ফান্ডের জন্য  আবেদন করে।

ষাটের দশকে শিক্ষকগণ খুব একটা প্রাইভেট টিউশনি করতেন না, যেমন একজন বোরহান স্যার ছিলেন তিনি অঙ্ক ও বিজ্ঞান পড়াতেন,  তবে প্রত্যেক ছাত্রকে হারিকেন নিয়ে যেতে হতো, কারণ তখনও বিদ্যুত্ বাসায় আসেনি তবে আমি কখনো প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়িনি। কারণ বাবার আর্থিক অবস্থা। জ্যামিতি আলজাব্রা মাথায় একদম ঢুকতো না,  এসএসসিতে পরীক্ষা দিয়েছি মুখস্ত করে, তাই স্পষ্ট মনে আছে ৬৪ পেয়েছিলাম। এরপর বিদঘুটে  এ বিষয়ের  ধারে কাছে ছিলাম না।

১৯৬৬ সাল, আমি  ক্লাস টেনের ছাত্র  আমি ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন, আন্তঃস্কুল ফুটবল খেলার প্রতিযোগিতায় আমরা এবং কলেজিয়েট স্কুল ফাইনাল, জানতে পেরেছিলাম কলেজিয়েট  স্কুল প্লেয়ার ভাড়া করেছে, সে সময়ে এর চল ছিল। আমাদের ড্রিল শিক্ষক বারী স্যারের পরামর্শে দুরু দুরু বক্ষে আমি সহ কয়েকজন হাজির হলাম স্যারের রুমে, আমাদের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে তিনি বক্তব্য দিলেন, নিজের স্বকীয়তায় চলবে, নিজের যোগ্যতায় খেলবে এবং লড়বে, ভাড়া করা খেলোয়াড় দিয়ে জয় পেলেও তাতে আনন্দ নেই। আমরা যদিও এক গোলে হেরে গিয়েছিলাম তারপরও যে আনন্দে আমরা খেলেছিলাম সেটা এখনো মনে আছে তাই সমাজতত্ত্ব বিভাগের অথবা  ছাত্র ছাত্রীরা কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে আমি কখনো বাহির থেকে কোনো শিল্পী ভাড়া করার উদ্যোগ নিতে নিরুত্সাহিত করতাম। 

সকাল পৌনে দশটায় ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে আমরাও লাইন করে স্কুলের সামনে এসেম্বলিতে লাইনে দাঁড়াতাম, স্কাউটদের ড্রামের তালে তালে শরীরচর্চা করতাম। দুপুরবেলা টিফিন  প্রত্যেক ক্লাসের ক্যাপ্টেন বিলি করতো। 

আমাদের সময়ে কোনো ক্লাসে শিক্ষক নেই এমন খুব কম ছিল, কোনো কারণে একজন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকতেন পরিবর্তে আরেকজনকে পাঠাতেন প্রধান শিক্ষক। সন্ধ্যায় আযানের সাথে সাথে ঘরে ফেরার নিয়ম ছিল, পড়াশোনা তাগিদ দিতেন  মা। সন্ধ্যার পর পাঞ্জাবি লেইনে রাস্তায় হাঁটলে শুধু গুনগুন শব্দ আসতো পড়াশোনার। বর্তমানে সম্পূর্ণ অবাস্তব।