চলিতেছে সীমা লঙ্ঘনের খেলা

বলা হইয়া থাকে, লোভ মানুষের জীবনের সবচাইতে বড় চালিকা শক্তি; কিন্তু সেই লোভেরও একটি সীমা রহিয়াছে। লোভ যদি সীমা লঙ্ঘন করে তখন তাহার কী পরিণতি হইতে পারে তাহা লইয়া বিশ্বসাহিত্যে একটি বিখ্যাত গল্প রহিয়াছে। বিশ্বখ্যাত উপন্যাসিক লেভ তলস্তয় তাহার ‘সাড়ে তিন হাত জমি’ গল্পে দেখাইয়াছেন আদিগন্ত বিপুল ভূমি ক্রয় করিতে গিয়া পাখোম কীভাবে মারা গিয়াছিলেন জমি প্রাপ্তির একদম শেষ মুহূর্তে। সস্তায় জমি ক্রয়ের শর্ত ছিল, পাখোম ভোর হইতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যতখানি হাঁটিবেন ততখানি জমির মালিক হইবেন তিনি। ‘লোভ’ নামের শয়তান পাখোমকে অস্বাভাবিক পর্যায়ে হাঁটাইয়া লইয়া যায়। শেষ পর্যন্ত মূল জায়গায় ফিরিয়া আসিবার অন্তিম ক্ষণে তাহার মৃত্যু হয়। আর মৃত্যুর পর তাহার কবরের জন্য প্রয়োজন হয় মাত্র ‘সাড়ে তিন হাত জমি’।

ভালোভাবে খাইয়া পরিয়া বাঁচিতে একজন মানুষের কত টাকা লাগে? তলস্তয়ের গল্পটির ভাবার্থ আমাদের বুঝাইয়া দেয়, কেহ যদি তাহার সীমা লঙ্ঘন করে তবে তাহার পরিণতি হয় ভয়াবহ। আমরা এখন চারিদিকে দেখিতেছি এই সীমা লঙ্ঘনের খেলা। ইহার পরিণতি যে ভয়াবহ হইবেই—তাহা আমরা ভুলিয়া যাই। অথচ এই ব্যাপারে আমাদের সামনে প্রতিদিনই কিছু না কিছু উদাহরণ তৈরি হইতেছে। গতকালের ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠা হইতেই একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। খবরে বলা হইয়াছে, বরিশালের মেঘনা নদীর তীরবর্তী মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা ক্ষমতাসীনদের দ্বন্দ্বে রক্তাক্ত হইতেছে প্রতিনিয়ত। সেইখানে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি দিনকে রাত্রি করিয়া তুলিতেছে। বিগত ছয় মাসে এইখানে কমপক্ষে ১০টি সশস্ত্র সংঘর্ষে ক্ষমতাসীনদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে পাঁচ জন নিহত হইয়াছেন। আহত হইয়াছেন নিদেনপক্ষে দুই শতাধিক। ইহার পাশাপাশি আহত হইয়াছেন ১০ জন পুলিশ সদস্যও। পুলিশের উপস্থিতিতেই সেইখানে ধারালো অস্ত্রশস্ত্রের মহড়া এবং সংঘর্ষ চলিতেছে। মেহেন্দিগঞ্জ কোনো বিশেষ ব্যতিক্রমী এলাকা নহে। সমগ্র দেশেই কমবেশি দ্বন্দ্ব সংঘাত সংঘর্ষ হত্যা নৃশংসতা জিঘাংসা প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছে। দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশময় ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী বা অঙ্গসংগঠনগুলি দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখিয়া বুঝিবার উপায় নাই তাহারা কাহার দ্বারা চালিত হইতেছে? কারণ একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠনের কোনো অংশই এইভাবে অপরাধী চক্রের মতো ভূমিকা পালন করিতে পারে না। অথচ আমরা দেখিতে পাইতেছি চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু, অস্ত্রব্যবসায়ী হইতে শুরু করিয়া অন্ধকার জগতের হেন কোনো মতলববাজ নাই যাহারা ক্ষমতাসীনদের ছাতার নিচে আশ্রয় লয় নাই। এই মতলববাজরা লক্ষ লক্ষ টাকার উেকাচের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার দুই-তিন-চার-নম্বরী ব্যবসা করিয়া লইতেছে। চলিতেছে দেদার লুটপাট। কোনো প্রকল্পের কাজ সামান্য কিছুটা করিয়া কিংবা না-করিয়াই বিল তুলিয়া লইতেছে। নিয়ম অনুযায়ী ইহা সম্ভব নহে। কিন্তু নিয়মের রক্ষকদেরও ইহারা দুই টাকা দিয়া ১০ টাকা পকেটে ভরিতেছে। অর্থ-ক্ষমতা-আধিপত্যের দম্ভে ইহারা বহুক্ষেত্রেই সামন্ত শাসকদের মতো আচরণ করিয়া থাকে। ফলে, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া, ইহাদের দ্বারা সংঘটিত খুন বা সংঘর্ষের ঘটনা আইন ও বিচারের আওতায় আসিতেছে না। এইভাবে ক্ষমতাশীলরাও যেন এই বার্তা দিতে চাহিতেছে—তাহারা যাহা খুশি তাহা-ই করিতে পারেন। এইভাবেই সকল কিছুর প্রতি ক্ষমতাবানদের সীমাহীন ঔদ্ধত্য ও অন্যদের অবজ্ঞা প্রকাশ পাইতেছে। এবং এইভাবেই তাহারা সমাজের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করিতেছে। অনেকেই মনে করেন, এই সামাজিক অস্থিরতার প্রাণভোমরা লুকাইয়া রহিয়াছে রাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত অস্থিরতার মধ্যেই।

এই যুগপত্ অস্থিরতা আমাদের কোথায় লইয়া যাইতেছে? অনেকেই মনে করেন, এইভাবে রক্তপাত ও হত্যাকাণ্ড এইভাবে চলিতে থাকিলে তাহা ক্রমাগত সীমাহীন প্রান্তরে ছড়াইয়া পড়িতে পারে। উহার অভিঘাত আসিতে পারে বৃহত্তর ক্ষেত্রেও। বিষয়টি ভয়ংকর। ইহা কি বিমর্ষকর কোনো অশনি সংকেত বহন করিতেছে?