সোভিয়েট বিপ্লব সফল হওয়ার পর ট্রটস্কি বলেছিলেন, ‘এক দেশে সাম্যবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলে সে রাষ্ট্র টিকবে না। সারা বিশ্বে সাম্যবাদী বিপ্লব ঘটাতে হবে। নইলে চারদিকে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র দ্বারা বেষ্টিত সাম্যবাদী রাষ্ট্র চতুর্দিকের নানা চক্রান্ত ও আগ্রাসনের মুখে খুব বেশি দিন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে না। স্টালিন তার অভিমতের বিরুদ্ধাচারণ করেন। ট্রটস্কি তার অভিমতের জন্য সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়ন থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন (পরে তাকে হত্যা করা হয়)। ট্রটস্কির কথায় যারা বিশ্বাসী, কমিউনিস্ট বিশ্বে তারা হাসিঠাট্টার পাত্র হন। তারা কোণঠাসা হয়ে যান।
কমিউনিস্ট বিপ্লবের অল্প দিনের মধ্যে লেনিন মারা যান। স্ট্যালিনের নেতৃত্বে যে সোভিয়েট রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, কিছুকাল পরে দেখা গেল অর্থনীতির ক্ষেত্রে সাম্যবাদ অনুসরণ করলেও সোভিয়েট ইউনিয়ন ক্রমশ একটি জাতি রাষ্ট্র (Nation state) হিসেবে গড়ে উঠেছে। তার কাছে অন্য দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের চাইতে রাশিয়ার জাতি-স্বার্থ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মিশরের নাসের তার দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন দমনের জন্য সে দেশের কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতাকে ফাঁসি দেন। সোভিয়েট ইউনিয়ন মিশরের সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষার জন্য তার জাতি-স্বার্থ রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেন।
সোভিয়েট ইউনিয়ন তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থে আরেকটি কম্যুনিস্ট দেশ নয়া চীনের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত হতে দ্বিধা করেনি। কম্যুনিস্ট চীন গড়ে উঠেছে আরো কট্টর জাতি রাষ্ট্র হিসেবে। ভারতে কম্যুনিস্ট আন্দোলনকে সাহায্যদানের পরিবর্তে হিমালয় এলাকায় ভূমি দাবি করে তাতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আদর্শের ক্ষেত্রে নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেও দেখা যায় বিভিন্ন দেশ শামুকের মতো শরীর খোলসে ঢেকে পশ্চাত্ দিকে হাঁটতে ভালোবাসে।
চীনে কম্যুনিস্ট বিপ্লব হওয়ার পর মাওজেদুং দেশের স্বার্থে প্রথম গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। আগের চিয়াং কাইশেকের আমলের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন একেবারে উত্খাত না করে তার ভগ্নাবশেষ রেখে দেন দেশ শাসনে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যাতে অভাব না ঘটে। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বড় বড় ব্যবসায়ীদের সম্পত্তি এবং মূল শিল্প রাষ্ট্রায়ত্ত করে ছোট ব্যবসায়ীদের এবং ভূস্বামীদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে দেন। শিল্পী, সাহিত্যক, লেখকসমাজ তথা চীনের এলিট ক্লাসের গায়েও তেমন আঁচড় কাটেননি।
তাতে কী হলো? চীনে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর না পুরতেই দেখা গেল সে দেশের এলিট ক্লাস আবার ধীরে ধীরে মাথা তুলছে। ব্যবসায়ী ও ভূস্বামীরা আবার শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ হয়ে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আঘাত করতে চাইছে। মাও জে দুং সতর্ক হলেন। তিনি ভেবেছিলেন, চীনে সাম্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা শিকড় গেড়েছে। রাষ্ট্র কিছুটা উদার হতে পারে। তিনি ‘শত ফুল ফুটতে দাও’—এই উদারনীতি ঘোষণা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন সিআইএর তত্পরতা শুরু হয়। বাংলাদেশের সুশীলসমাজের মতো চীনের পুরোনো এলিট ক্লাসের ভেতর থেকে কিছু ডিসিডেন্ট বুদ্ধিজীবী বের করে কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা উচ্ছেদের প্রচারণা শুরু হয়। চীন সরকার তাদের উদারনীতি গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
মাও জে দুং এরপর যে কাজটি করেন, ঠিক সেই কাজ বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু করেছিলেন বাকশাল গঠন করে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন চিয়াং কাইশেকের আমলের আমলাতন্ত্রের বিষদাঁত এখনো ভাঙেনি, সমাজে সুবিধাভোগী এলিট ক্লাসের আধিপত্য এখনো দূর হয়নি। বিপ্লবের পর কিছুকাল তারা কাছিমের মতো মাথা গুটিয়ে ছিল। এখন আবার সুবিধা পেয়ে মাথা তোলার চেষ্টা করছে। বঙ্গবন্ধু যেমন তার দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দিয়েছিলেন, মাও জে দুংয়ের কালচারাল রেভলিউশন বা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ডাক তেমনি। সমাজের সুবিধাবাদী শ্রেণি এবং নব্য আমলাতন্ত্রের কাঠামো ভাঙা এবং তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের হাতে ক্ষমতা পৌঁছে দেওয়া ছিল এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের লক্ষণ।
পশ্চিমা মিডিয়ায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে মাও জে দুংয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অপব্যাখ্যা শুরু হয়। বিদ্রুপ শুরু হয়। মাওয়ের যে সেনাপতি লিংপিয়াও ছিলেন তার সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাক্ষী, তাকে বিমান দুর্ঘটনা ঘটিয়ে হত্যা করানো হয়। কম্যুনিস্ট পার্টির ভেতরেই তখন সুবিধাবাদী শ্রেণি শক্তিশালী ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। মাওয়ের অভিনেত্রী স্ত্রী এবং আরো তিন সঙ্গী (gang of four) মাওয়ের আদর্শ রক্ষার শেষ চেষ্টা করেছিলেন। তারা ব্যর্থ হন। তাদের জেলে বন্দি করা হয়। শেষ জীবনে মাও ছিলেন এক প্রকার প্রাসাদবন্দি। একই অবস্থা ঘটেছিল বাংলাদেশে। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব বা শোষিতের বিপ্লব ব্যর্থ হয়। বাইরের শত্রুর সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে একদল বিশ্বাসঘাতক (মোশতাক গ্রুপ) হাত মেলায়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়।
রাশিয়ার ব্যাপারে ট্রটস্কির সতর্কবাণী সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। এই দেশে কম্যুনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা টেকেনি। সোভিয়েট ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর পর রাষ্ট্রটি ভেঙে পড়ে। নিরন্তর পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বিবাদে কম্যুনিজম টেকেনি। সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া এখন একটি ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র। চীনে কম্যুনিজম উত্খাত হয়েছে আরো বহু আগে। চীন এখন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী একটি শক্তিশালী ধনতান্ত্রিক দেশ। কম্যুনিস্ট পার্টি শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসে আছে। অর্থাত্ কমিউনিজম রাশিয়া ও চীনকে যতই একটি বৈষম্যহীন জগতের দিকে এগিয়ে নিয়ে থাকুক, রাষ্ট্র দুটি আবার শামুকের মতো পশ্চাত্ দিকে গুটিয়ে চলতে শুরু করেছে।
এবার বাংলাদেশের কথায় আসি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তিনি যে একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক জাতিরাষ্ট্র গঠন করেছিলেন, তার পতন ঘটে। আগের পচনশীল ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হয়। মিলিটারি শাসক জিয়াউর রহমান সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের টাকা লুট করে একটি নব্য এবং দুর্নীতিপরায়ণ ধনিক গোষ্ঠী তৈরি হতে দেন। একটি নতজানু সুশীলসমাজ গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শোষিতের বিপ্লব সফল করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বাকশাল গঠন করেছিলেন। এই বাকশালে যারা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন তাদের হত্যা করা হয়। এরপর যে দল সামরিক নেতাদের শাসনামলেই পুনর্গঠিত হয় তা বাকশাল নয়, আওয়ামী লীগ। শক্তিশালী বামপন্থি গ্রুপ এই দলে আর ফিরে আসেনি, তৈরিও হয়নি। আওয়ামী লীগ আবার নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগে ফিরে গেছে। এখন বাংলাদেশে যে শাসন চলছে তা আওয়ামী মুসলিম লীগের শাসন।
বাংলাদেশে যে ধর্ম নিরপেক্ষতা বা সমাজতন্ত্রের আদর্শ টেকসই হলো না, তার বড় কারণ উপমহাদেশে অর্থাত্ বাংলাদেশকে ঘিরে যে দেশগুলো রয়েছে, যেমন ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে সমাজতন্ত্রী অর্থনীতির অনুপস্থিতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার পতন। ভারতের মতো উপমহাদেশে গান্ধী-নেহেরুর ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের পতন এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদের অভ্যুদ্বয় সারা উপমহাদেশে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভবিষ্যেক বিপন্ন করে তুলেছে।
শুধু উপমহাদেশ নয়, সারা বিশ্বই আজ শামুকের মতো পেছনের দিকে হাঁটছে। আমেরিকার মতো মহাশক্তিধর দেশে নািসবাদের মতো ভয়ঙ্কর বর্ণবাদী ট্রাম্পইজমের আবির্ভাব হয়েছে। ট্রাম্প এখন ক্ষমতায় নেই কিন্তু ট্রাম্পইজম মার্কিন সমাজে প্রভাব বিস্তার করছে। ব্রিটেনে লেবার পার্টি শুধু সমাজতন্ত্রী আদর্শ থেকে পিছিয়ে যায়নি, ডানপন্থিদের কবলে পড়ে এখন দ্বিধাবিভক্ত হওয়ার পথে। টোরি পার্টি আরো ডানপন্থি এবং মার্কিনমুখী হয়েছে। জার্মানি, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়ায় নািসইজম আবার শক্তিশালী হচ্ছে। অর্থাত্ বিশ শতকে বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক ভবিষ্যত্ গঠনের পথে বিশ্ব যতটা এগিয়ে ছিল, একুশ শতকে ততটাই পিছিয়েছে।
বাংলাদেশে হেফাজতি উত্থান একটি ভয়ঙ্কর আশঙ্কা। পচনশীল ধনতন্ত্র সামাজিক অবক্ষয়কে দ্রুততর করছে। একমাত্র শেখ হাসিনা পিতৃ আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতার খোলসটি এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন। তাকে সাহায্য জোগাবে কে? এবারের করোনার হামলায় দেশের লড়াকু বুদ্ধিজীবীদের চৌদ্দ আনা মৃত্যুবরণ করেছেন। টিকে আছেন সুবিধাভোগী সুশীলসমাজ। যাদের দৃষ্টিও পেছনের দিকে। সামনের দিকে নয়। তাহলে আশার আলো কোথায়? বিশ্বের তরুণ প্রজন্মকে আশার আলো দেখাবে সেই দিশারী কোথায়? কবি বলেছেন, ‘দিনের সূর্য লুকিয়ে আছে ঘন মেঘের আড়ালে।’ কবি-বাক্য যদি সত্য হয়, তাহলে রক্তরাঙা দিগন্তে সেই শিশু সূর্যের উদয়ের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় আছে কি?
২২ মে, শনিবার, ২০২১
ইত্তেফাক/জেডএইচডি