বিজ্ঞানীদের নিগ্রহ

মাধব রায়

সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)

ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট

 

 

 

 

গতকালের পর

 

এমনি করে আট বছর ধরে আটকে রাখার পর ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে ঈশ্বরভক্তরা ব্রুনোকে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বলল।

ব্রুনো ক্ষমা চাইলেন? কমলা বললেন।

না না, ক্ষমা, ব্রুনো ছিলেন বিজ্ঞানী এবং সাহসী বিজ্ঞানী। তিনি গবেষণা করে যা পেয়েছেন, তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন এবং তা থেকে একচুল বিচ্যুত হতে তাঁর আত্মসম্মানে ঘা লাগে। তিনি ভুল স্বীকারের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন। ফলে বিজ্ঞানের ইতিহাসে জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হতে হলো ব্রুনোকে। ঈশ্বরবিরোধী অসত্য বক্তব্য প্রচার করার অপরাধে প্রকাশ্য স্থানে তাঁকে পুড়িয়ে মারা হলো।

মেরেই ফেলল? বলল চন্দ্রা।

হ্যাঁ, বিখ্যাত বিজ্ঞানী বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইনকেও সহ্য করতে হয়েছে ধর্মান্ধদের অত্যাচার। প্রাণিজগতের ক্রমবিকাশের ধারাবাহিকতা প্রথম তুলে ধরেছিলেন ডারউইন। ১৮৩১ সালের শেষদিকে বিগল নামের জাহাজে চড়ে ডারউইন জলপথে রওয়ানা হন। পাঁচ বছর সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জ থেকে নানান প্রজাতির প্রাণীর ফসিল সংগ্রহ করে গবেষণা শেষে সৃষ্টি করলেন বিবর্তনতত্ত্ব। লিখলেন বিখ্যাত গ্রন্থ Origin of Species by means of Natural Selection. কিন্তু ধর্মবিশ্বাসীরা তাঁর তত্ত্বকে মানতে চাইল না। তারা বলতে থাকল, ডারউইন তাঁর তত্ত্বে বানরকে মানুষের পূর্বপুরুষ বলেছেন। এটি মানুষের জন্য অবমাননার বিষয় এবং ধর্মগ্রন্থের বিরোধিতা। কাজেই ডারউইনের অপরাধ শাস্তিযোগ্য। ডারউইনকে পালাতে হলো গ্রামের বাড়িতে।

পরবর্তীতে ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ এসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স এর বৈঠকে বানরতত্ত্ব নিয়ে এক অসম বিতর্কের আয়োজন করা হলো। এক পক্ষে বিজ্ঞানী, আর অন্য পক্ষে বিজ্ঞানবিরোধী অক্সফোর্ডের বিশপ। ডারউইনের তত্ত্বের পক্ষে বলবেন তাঁর বন্ধু, বিজ্ঞানী টমাস হ্যানরি হাক্সলি। আর বিপক্ষে বক্তৃতা দেবেন বিখ্যাত বাগ্মী বিশপ স্যামুয়েল উইলবারফোর্স।

কিন্তু এটা তো মূর্খের সাথে তর্ক। বলল আকাশ।

হ্যাঁ, অনেকটা এরকমই। বললেন নীলকান্তবাবু। বক্তৃতায় ডারউইন তত্ত্বের বিরুদ্ধে এবং হাক্ললির বিরুদ্ধে ব্যাঙ্গাত্মক বক্তব্য দিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করে তুললেন বিশপ। বক্তৃতা শেষে বললেন-হাক্সলি কার দিক থেকে বানরের উত্তরসূরি? মা, নাকি বাবা?

তার মানে বিশপ বোঝাতে চাইলেন, হাক্সলির বাবা কিংবা মা বানর ছিলেন? বললেন কমলা।

ঠিক তাই, বললেন নীলকান্তবাবু। হাক্সলি কিন্তু এতে মাথা গরম করলেন না। তিনি মার্জিত ও ভদ্রভাবে ডারউইনের তত্ত্বের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করেন এবং উইলবার ফোর্সের বক্তব্যে বিজ্ঞানগত কী কী ভুল করেছেন তা তুলে ধরেন। ফলে উত্তেজিত দর্শক শ্রোতা মুহূর্তের মধ্যেই চুপসে যায়। হাক্সলিও বক্তৃতার শেষ অংশে বলেন-বংশগতভাবে আমি বানরের উত্তরাধিকারী হতে লজ্জাবোধ করি না। কিন্তু যে ব্যক্তি জেনে বুঝে সত্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে, তাঁর সাথে সম্পর্ক রাখতে আমি ঘৃণাবোধ করি। কারণ সে ভণ্ড, প্রতারক।

হাক্সলির বক্তব্যে সবাই মুগ্ধ হয়ে গেল এবং শ্রোতার দল বিশপের পক্ষ ত্যাগ করে হাক্সলির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করল।

                পরের অংশ আগামীকাল