ফিলিস্তিনে ইসরাইলের আগ্রাসি হামলা

গাজায় ধ্বংসস্তূপ যুক্তরাষ্ট্রে বিভক্তি

শিফারুল শেখ

 

ইসরাইলের আগ্রাসি হামলায় গাজা এখন একরকম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মাত্র ১২ দিন আগে যেখানে সুউচ্চ ভবন ছিল সেগুলোও এখন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে সেখানকার ফিলিস্তিনিরা এখন দিশেহারা। বিদেশি সহায়তার ওপরই তাদের এখন বেঁচে থাকতে হবে। কিন্তু এই হামলা নিয়ে সারা বিশ্বেই প্রতিবাদ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে জনমত ও প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টিতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় ডেমোক্র্যাট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স লেখেন, ‘?সত্যটা হলো, ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনি এলাকায় ইসরাইলই একমাত্র সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং শান্তি ও সুবিচারের পথে না গিয়ে তারা তাদের ভারসাম্যহীন ক্ষমতা এবং অগণতান্ত্রিক দখলদারিত্ব শক্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত।’ স্যান্ডার্সের শেষ শব্দগুলো ছিল ‘ফিলিস্তিনি লাইভস ম্যাটার’ অর্থাত্ ফিলিস্তিনি জীবনেরও দাম আছে। তার এই নিবন্ধ থেকেই ডেমোক্রেটিক শিবিরের বিভক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদের চাপেই প্রেসিডেন্ট বাইডেন শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের প্রতি সুর নরম করেন।

 

গাজা এখন ধ্বংসস্তূপ!

গত ১০ মে শবেকদরের রাতে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। ১৬ মে থেকে ইসরাইল ২১ লাখ জনসংখ্যার উপত্যকা গাজায় বিমান হামলা শুরু করে। হামাস ইসরাইলকে লক্ষ্য করে রকেট হামলা শুরু করে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক নেতারা যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও দুই পক্ষের কেউ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়নি। ১১ দিন ধরে ইসরাইল গাজায় বোমা হামলা অব্যাহত রাখে। উইকিপিডিয়া এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার রিপোর্টে দেখা গেছে, ইসরাইলের আগ্রাসি বিমান হামলায় ২৪৮ ফিলিস্তিনি গাজায় নিহত ও প্রায় ২ হাজার মানুষ আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৬৬ শিশু ও ৩৬ নারী রয়েছে। ঈদে মামার বাড়ি বেড়াতে এসে একই পরিবারের আট শিশু ও দুই নারী নিহত হয়েছেন। আর হামাসের ছোড়া রকেটে এক শিশুসহ ইসরাইলের ১২ জন নিহত হয়েছেন। তবে হামাসের রকেট থেকে ইসরাইলিদের রক্ষা করেছে আয়রন ডোম। এটি একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। রকেট, মর্টার বা অন্য যে কোনো অস্ত্র যাতে এসে ধাক্কা লেগে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। ইসরাইল সেনার দাবি, হামাসের ছোড়া রকেটের প্রায় ৯০ শতাংশই তারা এর সাহায্যে নিষ্ক্রিয় করেছে।

গাজার ৫১ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে ৪৬ স্কুল এবং দুটি কিন্ডারগার্ডেন, জাতিসংঘের একটি শরণার্থী সংস্থা, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজার একাংশ ধ্বংস হয়েছে ইসরাইলের বর্বর হামলায়। জাতিসংঘ পরিচালিত ৫৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৬৬ হাজার ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি ছেড়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। ছয়টি হাসপাতাল ও ১১টি প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেন্টারসহ ১৯টি চিকিত্সাসেবা কেন্দ্র, এমনকি গাজার একমাত্র করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা কেন্দ্রও মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে ইসরাইল।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল সংস্থা ইউনিসেফ বলেছে, ১ লাখের বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল। যুদ্ধবিরতির পর আশ্রয়কেন্দ্র মানুষ বাড়ি আসতে শুরু করেছে। শনিবার প্রথমবারের মতো ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে গাজায়। ইউনিসেফ জানায়, গাজায় ৮ লাখ মানুষ খাওয়ার পানির সংকটে রয়েছে। জাতিসংঘের সংস্থা প্যালেস্টিনিয়ান রিফিউজি বলেছে, সাহায্যের জন্য তাদের ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার প্রয়োজন। গাজার গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১ হাজার ৮০০ বাড়ি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ১ হাজার বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। গাজার বিদ্যুত্ লাইন এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০ থেকে ২১ ঘণ্টাই বিদ্যুত্ থাকে না।

 

ডেমোক্র্যাট শিবিরে বিভক্তি বাড়ছে কেন

ইসরাইল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে আমেরিকায় ব্যাপক বিভক্তি তৈরি হয়েছে। আগে যেমন একতরফতা ইসরাইলের প্রতি সমর্থন দিতে দেখা যেত, এখন সেই পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে, ডেমোক্রেটিক পার্টিতে ইসরাইলের ওপর থেকে সমর্থন কমে ক্রমেই ফিলিস্তিনের দিকে যাচ্ছে। বামপন্থি সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছেন। ইহুদি পরিবারে জন্ম নেওয়া এই সিনেটর ষাটের দশকে ইসরাইলে কয়েক বছর বসবাসও করেছেন। প্রখ্যাত মার্কিন জনমত জরিপকারী জন জগবির মতে, এই পরিবর্তন নাটকীয় ও গভীর। তিনি কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের জনমতের ওপর নজর রাখছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্ম এখন ফিলিস্তিনিদের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল। কিন্তু বাইডেন আমেরিকার প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে বলেছেন, আত্মরক্ষার অধিকার ইসরাইলের আছে। এই মন্তব্যে দলের ভেতর তিনি বেশ বেকায়দায়। কংগ্রেসে ঐতিহাসিকভাবে ইসরাইলের প্রতি প্রায় একতরফা সমর্থন দেখা গেছে। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল প্রভাবশালী ইহুদি ভোট যেটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান সম্প্রদায়, যারা কট্টর ইসরাইলপন্থি এবং রিপাবলিকানদের গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক। এই ভোট ব্যাংককে বিবেচনায় নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের                  ব্যাপারে ইসরাইলি ব্যাখ্যাই সব সময় কংগ্রেসে মেনে নেওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতিতেও এর প্রতিফলন হয়েছে। কিন্তু কংগ্রেসে বৈচিত্র্য আসায় ইসরাইলের প্রচলিত আমেরিকার প্রচলিত নীতি চাপের মধ্যে পড়েছে। জরিপ সংস্থা পিউ ফাউন্ডেশন স্টাডি বলছে, ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেটে নির্বাচিত সদস্যদের ২৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ, হিসপানিক, এশীয় এবং আদি আমেরিকান বংশোদ্ভূত। এটি রেকর্ড। ২০ বছর আগে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। ১৯৪৫ সালে ছিল মাত্র ১ শতাংশ। ট্রাম্প ইসরাইলকে কড়া সমর্থন দিয়েও আগের মতো ইহুদি ভোট পাননি। কারণ আমেরিকার ইহুদিরা অনেক বেশি উদার।

কংগ্রেসে তরুণ ও প্রগতিশীল সদস্যের জোট স্কোয়াডে আছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাশিদা তালিব এবং সোমালিয়ান বংশোদ্ভূত ইলহান ওমর। জোটে পরিচিত মুখ নিউ ইয়র্কের আলেকজান্ডার ওকাসিও কর্টেজ, যিনি প্রাইমারিতে সিনিয়র ডেমোক্র্যাট ও কট্টর ইসরাইলি সমর্থক জো ক্রাউলিকে হারিয়ে দলের টিকিট পেয়ে জিতেছেন। সন্দেহ নেই বাইডেন একটি সরু দড়ির ওপর হাঁটছেন। কংগ্রেসে তার গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনাগুলো পাশ করাতে দলের বামপন্থি অংশের সমর্থন তার জন্য জরুরি। এখন পর্যন্ত দলের এই অংশটি প্রেসিডেন্টকে সমর্থন করছে, কিন্তু ইসরাইলের যে আচরণকে তারা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখে সেগুলোকে যদি প্রেসিডেন্ট পাত্তা না দেন তাহলে তাকে ত্যাগ করতে তারা দ্বিধা বোধ করবে না। আর রাজনীতিকরা তদের সমর্থকদের বেশিদিন অবজ্ঞা করে টিকে থাকতে পারেন না।