করোনাকালীন অবসর কাটুক বই পড়ে

বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস ও সভ্যতা, বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার, জ্ঞানী ব্যক্তিদের চিন্তাধারা ও জীবন দর্শন প্রভৃতি বিষয় আমরা বই পড়ার মাধ্যমে জানতে পারি। অজানাকে জানা ও অচেনাকে চেনার যে চিরন্তন আগ্রহ, তা বই পড়ে মেটানো যায়। বই মানুষের অবসর সময় কাটানোর অন্যতম প্রধান উপায়। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির এই পরিস্থিতিতে খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়াই কাম্য আমাদের। তাই আমরা এই সময়ে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি। বইয়ের তাক থেকে ধুলো ঝেড়ে পড়ে ফেলতে পারি জমানো বইগুলো, যেগুলো আমাদের আগে কখনোই সময়ের অভাবে পড়া হয়ে উঠেনি।

‘Reading is to the mind what exercise is to the bodz’ এই কথাটি জোসেফ এডিসন বলে গিয়েছেন প্রায় ৩০০ বছর আগে। ব্যায়াম যেমন আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে তেমনি বই পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের মনকে সুস্থ ও আনন্দিত রাখতে পারি। একটি ভালো বই মানুষের মনের চক্ষু যেমন খুলে দেয় তেমনি জ্ঞান ও বুদ্ধিকে প্রসারিত ও বিকশিত করে মনের ভিতরে আলো জ্বালাতে সাহায্য করে। বই-ই হচ্ছে মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ যার সঙ্গে পার্থিব কোনো সম্পদের তুলনা হতে পারে না। একটা বই শুধু আমাদের তথ্য দেয় না, প্রশ্ন দেয় এবং নতুন করে চিন্তা করতে শেখায়। বই পড়ার মাধ্যমে আমাদের জ্ঞানের পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। যত বেশি বই পড়া যাবে, তত বেশি অজানা তথ্যের ভান্ডার খুলে যাবে আমাদের চোখের সামনে এবং আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। আর এই জ্ঞান সবসময় একজন মানুষকে সমৃদ্ধ করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বই পড়ার অভ্যাস মানুষকে Dementia এবং Alzheimer's নামে দুটি রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। বই পড়ার ফলে মানুষের মস্তিষ্কে যে উদ্দীপনা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয় তা মানুষের মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। শরীর সুস্থ রাখতে আমরা যেমন ব্যায়াম করি তেমনি মস্তিষ্ককে সবল ও কর্মচঞ্চল রাখতে বই পড়া বিশেষ জরুরি। কিছু কিছু কাজ আমাদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। অবাক করার মতো ব্যাপার, মাত্র ছয় মিনিটের জন্য বই পড়লে স্ট্রেস লেভেল ৬৮% পর্যন্ত কমে যায়, যা হাঁটা, কফি পান বা গান শোনার থেকে অনেকটা বেশি কার্যকর। বই পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা এক মুহূর্তে কোনো এক অজানা জগতে পৌঁছাতে পারি যা আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা, সমাজ সংসারের নানা দুঃখ কষ্ট থেকে একটু হলেও রেহাই দেয়, ফলে আমাদের মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়। যিনি বই লেখেন তিনি তার বইয়ের প্রতিটি পাতায় তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেন লেখার মাধ্যমে, তার সেই জ্ঞানের আলোয় আমরা আলোকিত হয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেয়ে থাকি। বই নতুনভাবে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে ও আমাদের মস্তিষ্ককে চিন্তা করার উপযোগী হিসেবে গড়ে তোলে। বইয়ের ভেতরে যে জগতের বর্ণনা থাকে আমরা বই পড়ার মধ্যে দিয়ে সেই জগিটর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারি। কারণ, পড়ার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে যেতে পারি। ফলে আমাদের মনন জগতের কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। দেশিবিদেশি বিভিন্ন ভাষার বই পড়লে আমাদের শব্দভান্ডারে নতুন নতুন শব্দের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কথা বলার সময় সেই শব্দগুলো ব্যবহার করে আমরা আমাদের বাচনভঙ্গিকে স্পষ্ট, সুন্দর ও তাত্পর্যমণ্ডিত করতে পারি। এতে ব্যক্তিজীবন উন্নত হয় এবং আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায়। নিয়মিত বই পড়ার ফলে আমাদের ভাবনাকে প্রকাশ করার ক্ষমতা বেড়ে যায়। সুন্দর কথা বলার মতো বেড়ে যায় লেখনীর দক্ষতাও। বিভিন্ন লেখকের লেখার বিভিন্ন শৈলীর সঙ্গে পরিচিতি ঘটার ফলে নিজস্ব লেখনীশক্তিও তার স্বাতন্ত্র্য খুঁজে পায়।

ক্রমাগত ভার্চুয়াল জগতে বিচরণ করার ফলে আমাদের মনোযোগ যেমন কমতে থাকে তেমনি বাড়তে থাকে মাল্টি টাস্কিংয়ের অভ্যাস। যার ফলে আমাদের স্ট্রেস লেভেল বেড়ে যায় আর প্রোডাক্টিভিটি কমে যায়। কিন্তু যখন আমরা কোনো একটি গল্পের বই পড়ি তখন আমাদের মনোযোগ সেই বইয়ের ভিতরে থাকা পৃথিবীটার সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে বই পড়ার অভ্যাস আমাদের একাগ্রতা শক্তি বৃদ্ধি করে। বই পড়ার মাধ্যমে তৈরি হয় এক সহানুভূতিপূর্ণ মানসিকতা। কল্পনানির্ভর বই পড়ার মাধ্যমে চরিত্রের সঙ্গে পাঠকের সুখ দুঃখ অনুভূতির একাত্মবোধ গড়ে ওঠে। বাস্তব জীবনেও এসব মানুষ অনেক বেশি সহানুভূতিপ্রবণ হূদয়ের হয়ে থাকেন।

সারাদিন শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে পড়ে থেকে হতাশ না হয়ে আমাদের এই করোনাকালীন অফুরন্ত অবসর সময়ে বেশি বেশি বই পড়ার অভ্যাস চর্চা করা উচিত। এতে আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যও সুস্থ থাকবে। তাই আসুন আমরা সবাই নিজেরা নিয়মিত বই পড়ি এবং অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করি বই পড়ার জন্য।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়