বিলুপ্তপ্রায় বাতাসি ফিরছে বাজারে

ভোজন রসিকদের কাছে বাতাসি মাছের রয়েছে আলাদা কদর। আকারে ছোট, দেহ চ্যাপটা ও এর ওপরের চোয়াল নিচের চোয়ালের চেয়ে কিছুটা লম্বা এ মাছ খেতে খুবই সুস্বাদু। কিন্তু বাজারে গেলে সচরাচর এ মাছের দেখা পাওয়া যায় না। পরিবেশ বিপর্যয়সহ নানা কারণে মাছটি এখন বিপন্ন্নের তালিকায় চলে গেছে। তবে সুখবর হলো, সম্প্রতি কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় বাতাসি মাছের পোনা উত্পাদনে সফল হয়েছেন বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা।

বগুড়া জেলার সান্তাহারে অবস্থিত ইনস্টিটিউটের প্লাবনভূমি উপকেন্দে  এই সফলতা অর্জিত হয়। গবেষক দলে ছিলেন ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ডেবিড রিন্টু দাশ, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান ও মালিহা খানম।

বিএফআরআই সূত্র জানায়, যমুনা ও আত্রাই নদীসহ বিভিন্ন উত্স থেকে বাতাসি মাছের পোনা সংগ্রহ করে প্রথমে পুকুরে তা নিবিড়ভাবে প্রতিপালন করা হয়। প্রতিপালনকালে বাতাসি মাছের খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করে খাবার সরবরাহ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পরিপক্ক বাতাসি মাছের খাদ্যনালিতে শতকরা ৮৬ ভাগ প্লাংটন ও ১৪ শতাংশ অন্যান্য খাদ্যবস্তুর উপস্থিতি রয়েছে। তাছাড়া বছরব্যাপী জিএসআই ও হিস্টোলজি পরীক্ষণের মাধ্যমে বাতাসি মাছের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম নির্ধারণ করা হয়। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বাতাসি মাছের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম হচ্ছে মে-জুলাই। এ মাছের ডিম ধারণ ক্ষমতা আকার ভেদে হচ্ছে ১২০০-২৫০০টি। গবেষণায় আরো দেখা যায়, একটি পরিপক্ক স্ত্রী বাতাসি মাছ ৪.০ থেকে ৬.০ গ্রাম ওজনের হলেই প্রজনন উপযোগী হয়। প্রজনন উপযোগী পুরুষ বাতাসি মাছ স্ত্রী বাতাসির চেয়ে আকারে আপেক্ষাকৃত ছোট (২.৫-৪.০ গ্রাম) হয়। গবেষণার আওতায় চলতি মে মাসে বাতাসি মাছকে হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়। হরমোন প্রয়োগের ১২-১৫ ঘণ্টা পর বাতাসি মাছ ডিম ছাড়ে এবং ২৩-২৫ ঘণ্টা পরে নিষিক্ত ডিম থেকে রেণু পোনা উত্পাদিত হয়। ডিম নিষিক্ততার হার ছিল শতকরা প্রায় ৭৩ ভাগ। উত্পাদিত রেণু বর্তমানে প্লাবনভূমি উপকেন্দে র হ্যাচারিতে প্রতিপালন করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)’র তথ্য মতে, বাংলাদেশের স্বাদু পানির ২৬০টি মাছের মধ্যে ৬৪টি প্রজাতি বিলুপ্ত প্রায়। এরমধ্যে ৯টি অতিবিপন্ন, ৩০টি বিপন্ন এবং ২৫টি শংকাগ্রস্ত। বিলুপ্তপ্রায় মাছের তালিকায় বাতাসিও রয়েছে। তবে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উত্পাদনের ফলে এ মাছটি এখন সহজেই চাষ করা সম্বব হবে। বাংলাদেশ ছাড়াও মাছটি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও মায়ানমারে পাওয়া যায়।

এ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বিলুপ্তপ্রায় মাছ পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে ইনস্টিটিউটের তাদের গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করেছে। সামনে আরো অনেক বিপন্ন মাছের কৃত্রিম প্রজনন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে ব্যবহারের ফলে দেশীয় মাছের উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১২ বছরে পুকুরে দেশীয় মাছের উত্পাদন প্রায় চার গুণ বেড়েছে বলে জানান তিনি।