তরুণ মনে দুই চাকার ফাঁদ

মোটরচালিত দ্বিচক্রযান, অর্থাত্ মোটরসাইকেল সারা বিশ্বেই তুমুল জনপ্রিয়।  উঠতি বয়সি কিশোর থেকে শুরু করে যুবক কিংবা অফিস-আদালতে যাতায়াতের জন্য অনেকেই মোটরবাইক ব্যবহার করেন। গণপরিবহনের সংকট ও যানজটের কারণে শহরে দ্রুতই মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গ্রামেও। আর এরই সঙ্গে সঙ্গে দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ?্যমে সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। কেননা, মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনাও ঘটে অহরহ। একক কোনো যানবাহনে সর্বাধিক এই বাহনের সংখ্যা বাংলাদেশে বর্তমানে মোট নিবন্ধিত পরিবহনের অর্ধেকেরও বেশি। আর প্রতিনিয়ত এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেপরোয়া গতি, দল বেঁধে প্রতিযোগিতা ছাড়াও ট্রাফিক তদারকির অভাবেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বেপরোয়া চালনা, মাত্রাতিরিক্ত গতি, আইন না মানা এবং চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণ না থাকা। প্রকৃতপক্ষে সড়কে শুধু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই ঘটছে না, অন্যান্য দুর্ঘটনাও ঘটছে অহরহ। আর এর প্রধান কারণ চালকদের বেপরোয়াপনা। এছাড়া সড়কের আতঙ্ক হচ্ছে কিশোর বাইকাররাও। এসব কিশোর বাইকার সড়কের প্রত্যেক মানুষের জন্য আতঙ্ক। অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে অভিভাবকদের মোটরসাইকেল তুলে দেওয়া এবং দেশে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক মোটরসাইকেল-সংস্কৃতি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব দুর্ঘটনায় সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্বের পাশাপাশি প্রাণও হারাচ্ছেন অনেকে। গণপরিবহনের পরিবর্তে অনেকেই দূরের গন্তব্য পাড়ি দেন মোটরসাইকেলে। আর এতে বেড়ে যায় দুর্ঘটনাও। আইন না মানা, উঠতি বয়সিদের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, অদক্ষ চালক ও সতর্কতার অভাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ব্যাপক হারে ঘটে থাকে। দুর্ঘটনা ঘটেছে অন্য বাহনের সঙ্গে টক্করের মাধ্যমে। মোটরসাইকেল চালকেরা নিয়ম না মেনে বেপরোয়াভাবে রাস্তায় চলাচল করেন। এতে দুর্ঘটনার শিকার হন। অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা এবং অসাবধানতাও এসব দুর্ঘটনার কারণ। বস্তুতম, এসব কারণে বেড়েই চলেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। আর এর পেছনে রয়েছে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা। এসব বাইক দুর্ঘটনার কারণে কেউ সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করছেন, আবার কেউ পরপারে চলে গেছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই মাসে সারা দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩১৫টি আর এতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১৯ জন। একই ফাউন্ডেশন বলছে, ২০২০ সালে সারা দেশে ৪ হাজার ৭৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যা ১ হাজার ৩১৮; আর এতে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৬৩ জন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক ও দুুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্যমতে, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় শীর্ষে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। 

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা কঠিন কাজ নয়। প্রথমত, ১৮ বছরের কম বয়সিদের কাছে মোটরসাইকেল বিক্রি নিষিদ্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মোটরসাইকেলচালকদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জানাতে হবে। সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনিটরিং। চালক বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালালেই তাকে থামিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর একটি বড় কারণ হেলমেট না থাকা কিংবা নিয়মানুসারে হেলমেট ব্যবহার করা। তাই শুধু শহরেই নয়, গ্রামাঞ্চলেও চালক ও পেছনের আরোহীর ভালো মানের হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। মোটরসাইকেল চালানোর জন্য সড়কে আলাদা কোনো লেন নেই। তাই চালককে বিশৃঙ্খলভাবে মোটরসাইকেল চালাতে দেখা যায়। মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা লেন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ করতে পারলে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে সন্দেহ নেই। তাই মোটরসাইকেলচালকদের  মোটিভেশনেরও দরকার রয়েছে। আর এই মোটিভেশন হতে পারে পরিবারের ভেতরেই। পরিবারের অন্য সদস্যরা যদি মোটরসাইকেল চালক সদস্যকে সাবধানে চালানোর দীক্ষা দিতে পারেন, তাহলে তা দুর্ঘটনা রোধে বড় সহায়ক হবে। আমরা নিজ নিজ জায়গা থেকে সবাই সচেতন ও আইনের বাস্তবায়ন করলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়