সম্প্রতি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, মানব উন্নয়ন সূচক ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতিবাচক ধারায় এগোচ্ছিলো। বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছিলো। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাবে তা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে স্থবির অর্থনীতির চাকা সচল করতে এবং নারীর অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে নারীর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চাহিদাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী আসন্ন ২০২১-২২ সালের জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখতে হবে।
সেইসঙ্গে এই বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যয় করা হচ্ছে কিনা এবং নারীরা এর সুফল পাচ্ছে কিনা তা নিয়মিতভিত্তিতে পরিবীক্ষণ করতে হবে।
সোমবার সকালে ‘জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট ২০২১-২২: বিবেচ্য বিষয়সমূহ’শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এ সব কথা বলেন। স্টেপস্ টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট এবং গ্যাড অ্যালায়েন্স যৌথভাবে এই ওয়েবিনারের আয়োজন করে।
অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, গতবছর কোভিড মহামারীর মধ্যে একটি আপৎকালীন বাজেট তৈরি করার কারণে নারীর ইস্যুগুলির দিকে মনোযোগ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। এ বছর সুযোগ এসেছে জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্যের জায়গাগুলিতে দৃষ্টি দেওয়া এবং গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য খাতগুলিতে বাজেট বরাদ্দ করা। যেমন এতোদিনকার উপেক্ষিত স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। করোনায় শহরাঞ্চলে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ হারানো নারীদের জন্য কাজের ব্যবস্থা করা এবং নতুন উদ্যোক্তা হিসাবে গড়ে তুলতে তাদের জন্য শর্তগুলো শিথিল এবং সহজ করতে হবে। করোনাকালীন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ সকল কর্মসূচিতে নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে।
বিআইডিএসএর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, অভিবাসী যেসব নারী করোনার কারণে দেশে ফেরত এসেছেন তাদের কোনো আর্থিক বা আইনি সহায়তা লাগলে বাজেটে তার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ইতোমধ্যে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ যেন তারা সঠিকভাবে এবং যথাসময়ে পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অতি ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা দিতে বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্যাকেজের আওতা বাড়াতে হবে এবং নারীদের জন্য আলাদা করে ৫০ শতাংশ বরাদ্দের কথা উল্লেখ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, আমাদের অনেক নীতি ও পরিসংখ্যান আছে, জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেটের আওতায় নারী-পুরুষের জন্য বিভিন্ন রকম বরাদ্দ আছে। কিন্তু এ বরাদ্দগুলো কিভাবে ব্যয় করা হবে, কাদের দ্বারা করা হবে, বাস্তবায়িত না হলে দায়ীদের শাস্তি দেওয়া হবে কিনা ইত্যাদি প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা যতদিন সঠিকভাবে না পাবো কিংবা মনিটরিংটা সঠিকভাবে হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন বলেন, কোভিড মহামারিকে একটি স্বাস্থ্যগত দুর্যোগ বলা যায়, যা নারী ও মেয়েশিশুসহ বিভিন্ন ঝুঁকির মধ্যে থাকা গোষ্ঠী, যেমন হিজড়া, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের অর্জনগুলোকে ম্লান করে দিতে পারে। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য খাদ্য, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, আশ্রয়ণ প্রকল্প, জীবিকা ও কর্মসংস্থান, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা হ্রাস ইত্যাদির জন্য নারীবান্ধব ও দরিদ্রবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।
ওয়েবিনারে আরও বক্তব্য রাখেন দীপ্ত ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জাকিয়া কে হাসান, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাল্টি-সেক্টরাল প্রজেক্টের সাবেক পিডি ড. আবুল হোসেন প্রমুখ। ওয়েবিনার সঞ্চালনা ও ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন স্টেপস্-এর নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার।
ইত্তেফাক/ইউবি