আহসান জোবায়ের, জবি সংবাদদাতা
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন থেকে দূরে থাকার কারণে মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী। পরিবর্তন এসেছে তাদের আচার-আচরণেও। তবে শিক্ষার্থীদের এই অবসাদ কাটাতে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তাদের পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা। স্বাভাবিক অবস্থায় ক্যাম্পাসে আসা, ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নেওয়া, সহপাঠীদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া, রিহার্সাল, বিভিন্ন সংগঠনের মিটিং, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, টিউশনি, অ্যাসাইনমেন্ট করাসহ নানা রকমের কর্মকাণ্ডে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সময় পার করলেও বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন হওয়ায় পালটে গেছে তাদের জীবনের প্রক্রিয়া। মেজাজ খিটখিটে থাকা, অস্বাভাবিক আচরণ করা, হতাশাগ্রস্ত হওয়াসহ বেশ কিছু মানসিক জটিলতায় ভুগছেন অধিকাংশ শিক্ষার্থী।
জানা যায়, করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে ঘোষিত ছুটিকে শুরুতে শিক্ষার্থীরা এক সপ্তাহ বা ১৫ দিনের ছুটি ভেবে উত্ফুল্ল মনে নিজ নিজ বাড়িতে যান। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে করোনা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি। অন্যদিকে প্রথম এক-দুই মাস বাড়িতে পরিবার, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও গ্রামীণ পরিবেশকে উপভোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভালো সময় কাটালেও ছুটি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মানসিক অবস্থা খারাপ হওয়া, একঘেয়েমি জীবন বিরক্তিকর মনে হওয়াসহ বেশ কিছু কারণে ধীরে ধীরে তারা মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে গ্রামে দুর্বল নেটওয়ার্ক সংযোগ, ডেটা কেনার অসামর্থ্য, ডিভাইস না থাকাসহ বেশ কিছু কারণে অনলাইন ক্লাস থেকেও পিছিয়ে পড়েন অধিকাংশ শিক্ষার্থী। ফলে পড়াশোনা ও অনার্স শেষ করার অনিশ্চয়তা নিয়েও তাদের মধ্যে অনেকটা হতাশা ও বিষাদ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মানসিক অবসাদ সম্পর্কে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ। শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা, হতাশা এখন অবশ্যই খারাপের দিকে। বিভিন্ন ডেটাও তাই বলে। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে হলে পরিবার, শিক্ষক, মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার। বাসায় শিক্ষার্থীদের পরিবার তাদের দিকে সার্বক্ষণিক খেয়াল রাখতে পারে। পড়াশোনার পাশাপাশি গল্পগুজবসহ বিনোদনের ব্যবস্থা করা গেলে এসব শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শাহিনুজ্জামান বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে সার্বিকভাবেই মানুষের মানসিক অস্থিরতা বেড়েছে। মহামারিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগের দূরত্ব সৃষ্টির কারণেও শিক্ষার্থীরা হতাশাগ্রস্ত হন। শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রশান্তির জন্য এখন অনলাইন প্ল্যাটফরমে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কারণ সরাসরি দেখা করার কোনো সুযোগ এখন নেই। তাই অনলাইনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিজ নিজ বিভাগ, অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, সংগঠন বা ছাত্রকল্যাণ থেকেও প্রতিনিয়ত যোগাযোগাযোগ করে তাদের সমস্যা ও অনুভূতি জানার মাধ্যমে তাদের কাউনসেলিং করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা তাদের সমস্যাগুলো শেয়ার করলে অনেকটা প্রশান্তি পাবেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান খান বলেন, দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাস থেকে দূরে থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও অবসাদ তৈরি হয়েছে। এটাই বাস্তবতা। এক বছর দুই মাস ধরে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবন প্রক্রিয়া পরিবর্তিত হয়েছে। এখন শিক্ষার্থীরা ঘরের ভেতরে বন্দি আছেন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রথম ও শেষ সমাধান হলো, যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষার্থীদের আবারও আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া। তাদের সামাজিক জীবন ও ক্যাম্পাস-জীবন স্বাভাবিক করতে হবে।