পুলিশের বিচারিক ক্ষমতা ও বিতর্ক

বিচার প্রক্রিয়া হচ্ছে একটি দেশের বা জাতির সভ্যতার প্রতীক। সৎ ও স্বাধীন বিচার বিভাগ নিঃসন্দেহে একটি দেশের উন্নতি নির্ণয়ের অন্যতম প্যারামিটার। বিচার কোন ছেলেখেলা বিষয় নয়। নিশ্চয়ই কোন অপেশাদার বা অ্যামেচার কাউকে দিয়ে বিচারকার্য করা যাবে না। 

বিশেষজ্ঞ নন এমন কাউকে দিয়ে আদালত চালালে সাধারণ মানুষ বা বিচারপ্রার্থীরা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিচার করতে হবে অবশ্যই স্পেশালিস্ট ব্যক্তিকে দিয়ে। একটি সৎ, দক্ষ ও মানসিকভাবে স্বাধীন বিচার বিভাগ কিন্তু একদিনে তৈরি হয় না। দিনের পর দিন প্রশিক্ষণ,চর্চা ও কাজের মাধ্যমেই আমরা একটি স্বাধীন ও সৎ বিচার বিভাগ পেতে পারি। দেশের আপামর জনসাধারণের এই প্রত্যাশায় হয়তো মাজদার হোসেন বনাম রাষ্ট্র মামলাটি দায়ের হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় অনেক দেনদরবার করে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের আদেশ দেন। আমার ধারণা কোন রাজনৈতিক সরকার থাকলে সেটা সম্ভব হতো না।

এখানে উল্লেখ্য যে বিচারের ক্ষেত্রে বিচারক, তদন্তকারী সংস্থা (পুলিশ বা অন্য কেউ) এবং আইনজীবী এই তিনটি পক্ষের সঠিক সমন্বয়েই একটি সুষ্ঠু বিচার হতে পারে। 

২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ (স্বাধীন নয়) এর পর এডমিন ক্যাডারের অব্যাহত চাপ বা ইচ্ছার কাছে সরকার আত্মসমর্পণ করে। ফলশ্রুতিতে ২০০৯ সালের মোবাইল কোর্ট আইন। প্রথম দিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের তফসিলে অল্প কিছু আইনের ধারা থাকলেও আমলাদের আবদার অনুযায়ী আস্তে আস্তে বাংলাদেশের প্রায় সব আইন সমূহই এখন মোবাইল কোর্টের এখতিয়ারের মধ্যে। 

যদিও মোবাইল কোর্ট আইন পরিচালনার পদ্ধতিটিই আমাদের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। আমরা জানি যে ভ্রাম্যমাণ আদালত বাতিল সংক্রান্ত রিটের শুনানিটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে পেন্ডিং আছে এবং অদূর ভবিষ্যতে শুনানি হবে সেটাও বলা যায় না। প্রশাসনের আমলারা কোনভাবেই বিচারিক ক্ষমতা ছাড়তে চান না। একজন সহকারী কমিশনার (প্রশাসন) কখনো সরকারের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, কখনো মন্ত্রী মহোদয়ের প্রটোকল অনুসরণ করেন, কখনো পাবলিক পরীক্ষার দায়িত্ব, কখনো আইনশৃঙ্খলার, কখনো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা, ঝড় বা বন্যার দায়িত্ব শেষে বিচার কার্যটিও করতে চান। যদিও বিচারটা হওয়া উচিৎ প্রফেশনাল ব্যক্তিদের দ্বারা। 

এই সব দেখে এখন আমাদের পুলিশ বিভাগেরও ইচ্ছা করছে তারাও একটু বিচার করবে। তারা হয়তো মনে করছে এডমিন ক্যাডারের কথা সরকার বাহাদুর শুনলে তাদেরটাও শুনবে। কারণ তারাই তো দেশের সব। অথচ আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থার সিস্টেম অনুযায়ী যেকোনো অপরাধ বা অভিযোগ বিষয়ে প্রাথমিকভাবে পুলিশ তদন্ত করবে। এখন যদি তদন্তকারী সংস্থা নিজেই বিচারক হয়ে যায় তাহলে কী হবে। 

যদিও ফৌজদারি কার্যবিধির ১২ ধারা অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র যেকোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিতে পারেন। তাই বলে পুলিশকে কেন? আর পুলিশকেই দিতে হবে তা তো ফৌজদারি কার্যবিধির ১২ ধারায় বলা নাই। বিশেষ অবস্থার জন্য তো মোবাইল কোর্ট ছিলই। মন্দের ভালো। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা সমর্থন করি না। বিকল্প হিসাবে সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকগণকে বা এই রকম অন্য কোন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া যায়।

এছাড়াও পুলিশ সম্পর্কে আমাদের সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয়। তাহলে কী সরকার এডমিন বিভাগের মতো পুলিশ বিভাগের আবেদন অগ্রাহ্য করতে পারবে না? আমরা যারা বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত তাদের দীর্ঘ দিনের দাবি যেকোন মামলা বা অভিযোগ তদন্তে একটি পৃথক ও স্বতন্ত্র পুলিশি তদন্ত সংস্থা গড়ে তোলা। যারা মামলার তদন্ত ব্যতীত অন্য কোন কাজ করবে না। একইভাবে সরকারি মামলা পরিচালনার জন্য একটি পৃথক, স্বতন্ত্র ও স্থায়ী প্রসিকিউটিং এজেন্সি থাকবে। যদিও এটা আজকের আলোচনার বিষয় নয়। 

প্রত্যেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজ দায়িত্বটুকু সঠিকভাবে পালন করলেই সমাজ তথা দেশের মঙ্গল হয়। নিজ দায়িত্ব পালনটাই তাদের দেশপ্রেমের পরিচয় বহন করে। কিন্তু বর্তমানে প্রায় সব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের দেশপ্রেমের প্রমাণ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হতে চায়। এখন সামরিক আমলা, প্রশাসন আমলা, পুলিশ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্ষেত্র বিশেষে বিচার বিভাগসহ সবাই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়। নিজ দায়িত্ব পালন না করলেও অতিরিক্ত হিসাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা চায়। 

এরই ধারাবাহিকতায় আজ পুলিশ বাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি আলোচনা এসেছে বলে আমি মনে করি। অথচ দেশ পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি থাকা উচিৎ রাজনীতিবিদের হাতে। একজন রাজনীতিবিদ কিন্তু এক দিনে তৈরি হয় না। তারও একটা প্রক্রিয়া আছে। আস্তে আস্তে একজন নেতা তৈরি হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখানেও আমলা ও ব্যবসায়ীরা হানা দিয়েছে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, যার যা কাজ তাকে সেটা করতে দিন। পুলিশকে এই সামান্য ও সংক্ষিপ্ত বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি হয়তো এখন অনেকই গুরুত্ব নাও দিতে পারেন, কিন্তু ভবিষ্যতে তা কারও জন্য মঙ্গলজনক হবে না।

 

লেখক: অ্যাডভোকেট, সাধারণ সম্পাদক, রাজশাহী এডভোকেট বার এসোসিয়েশন, রাজশাহী। 

ইত্তেফাক/এএএম