তপন চৌধুরী
ফুসফুস ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াই করে পরাজয় মেনে নিলেন সোলস ব্যান্ডের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও খ্যাতিমান ড্রামার সুব্রত বড়ুয়া রনি। গতকাল ভোর ৫টার দিকে ঢাকার ডেল্টা ক্যান্সার হাসপাতাল চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর।
উল্লেখ্য, গতবছর দেশে করোনা আতঙ্ক ছড়ানোর শুরুর দিকে সুব্রত বড়ুয়া রনির ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ে। তখন থেকে রাজধানী মিরপুরের ডেল্টা হাসপাতালে তার চিকিত্সা চলছিল। সুব্রত বড়ুয়া রনি ৫ দশক সংগীতাঙ্গনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৭০ সালে চট্টগ্রামের কয়েকজন গান পাগল তরুণ গঠন করে গানের দল সোলস।
গত কয়েকমাস ধরেই আমার পরিচিত সংবাদকর্মীদের কাছে আমি একটিই মিনতি করেছিলাম যে, রনি দার উন্নত চিকিত্সার যেন একটা ব্যবস্থা রাখা হয়। তার একটি লেখা ইত্তেফাকেও ছাপা হয়েছিল। আসলে যে মানুষটির জন্য আমার আজকের এই তপন চৌধুরী হওয়া, তিনিই সুব্রত বড়ুয়া রনি। আমার সংগীতশিল্পী স্বত্বার জন্মদাতা। কৈশোরে মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়সহ একাধিক শিল্পীর আধুনিক গান তুলতাম, গাইতাম। রনি দা’র বাড়ি আর আমার বাড়ি কাছাকাছি। তখন রনি দা ‘সুরেলা’ নামের একটি ব্যান্ড গড়ে তুলেছিলেন। সেই সময় কেরোসিনের সংকট ছিল। লাইন ধরে কেরোসিন নিতে হতো। চট্টগ্রাম লালদিঘীর পাড়ে গিয়েছি কেরোসিন আনতে। সেখানে একটা বন্ধ বাসে হেলান দিয়ে আমি আর রনি দা দাঁড়িয়ে। আমি গুনগুন করে গান গাইছি। ‘সুন্দরী গো দোহায় দোহায় মান করো না।’ পাশে দাঁড়ানো রনি দা মার্ক করলেন। বললেন, ‘এই তুমি তো সুন্দর গান করো? আরেকটা করো তো? আমি শোনাতে থাকলাম। রনি দা বাসের বডিতে হাত দিয়ে তবলার মতো তাল দিতে থাকলেন। অনেকক্ষণ চললো। এরপর রনি দা বললো, আমরা তো একটি ব্যান্ড করেছি। ইন্সট্রুমেন্টাল করি। আমাদের কোনো সিঙ্গার নেই। তুমি সন্ধ্যায় আমাদের প্র্যাকটিসে আসো। তখন ডিসি হিলে তাদের আড্ডা। সেখানে বাংলাদেশ নার্সারীর পাশে সিঁড়িতে বসে রনিদাকে অনেকগুলো গান শোনালাম। সেভাবেই প্রথম আমার অডিশন। গান শোনানো শেষে বললেন, ‘আমাদের আগামীকাল হ্যামসেন লেনে একটা প্রোগ্রাম আছে। কাল তুমি আমাদের সাথে গাইবা।’ মানুষটির সেই কথায় আমার কৈশোরটা অন্যরকম হয়ে গেল। এভাবেই শুরু। সেই বাসে হেলান দেওয়া এক কিশোরকে তুলে এনে আমার রনি দা আমাকে শিল্পী তপন চৌধুরী বানিয়েছে। এই মানুষটির প্রতি আমার ঋণ আমি কীভাবে শোধ করবো? দাদার পরিবারের সবার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। শেষদিকে ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণে রনি দার সঙ্গে তো বেশি কথা বলতে পারিনি। কিন্তু মানুষটার সঙ্গে কতশত স্মৃতি। সুব্রত বড়ুয়া রনি চট্টগ্রাম সংস্কৃতির জন্য অনেককিছু করেছেন। সোলস গড়েছেন, অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়ে ছিলেন। সর্বশেষ মাসখানেক আগে রনি দাকে যখন দেখতে গেলাম। দেখি মানুষটা শুকিয়ে চার ভাগের একভাগ হয়ে গেছেন। তাকে দেখে কষ্টে চোখ দুটো ভারী হয়ে আসছিল। আমার এবারের বাংলাদেশ সফরটা খানিক অভিমান আর মন খারাপের। সেই মন খারাপ নিয়ে যখন ফিরছি কানাডায় পরিবারের কাছে। বাসায় ঢুকতেই খবর পেলাম আমার/আমাদের রনি দা আর নেই! ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে দিনরাতের স্মৃতি মানুষটির সঙ্গে। এত হ্যান্ডসাম একটা মানুষ। মৃত্যু নিয়ে গেল কোনো এক অন্তিম যাত্রায়। এখনো ভাবলে মনে হয় এইতো সেদিন! রনি দা ভালো থেকো তুমি। যতদিন বেঁচে আছি স্টেজে তোমাকে স্মরণ করে যাবো। তোমাকে ভুলতে পারবো না। সেটা সম্ভব না।’
লেখক :দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী