রেজাউল হক কৌশিক
করোনাকালীন রপ্তানি কমে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে শুরু করেছে। অবশ্য এ সময়ে যেহারে ঘাটতি বাড়বে বলে আশঙ্কা ছিল তেমন ঘটেনি। করোনার সময়ে রপ্তানি যেমন কমছিল অন্যদিকে আমদানিও ব্যাপকহারে কমে গিয়েছিল। তাতে কমে এসেছিল বাণিজ্য ঘাটতি। সম্প্রতি আবার বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে শুরু করেছে। চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) প্রথম নয় মাস জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৪৯ কোটি ৭০ লাখ ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কম হয়েছে। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, করোনার কারণে বৈদেশিক বাণিজ্য প্রায় বন্ধ ছিল। আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য গার্মেন্ট খাতে রপ্তানি কমেছে। গার্মেন্ট পণ্যে মূল বাজার ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনার প্রকোপ বেশি ছিল। অন্যদিকে করোনার কারণে আমদানি বাণিজ্য যে স্থবির হয়ে পড়েছিল তাতেও এখন গতি এসেছে। এ কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে শুরু করেছে। বাণিজ্য ঘাটতি বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার কারণেই আবার বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। করোনার কারণে বিশ্ব বাজারে পণ্যের চাহিদা অনেক কমে গেছে। করোনার সময়ে আমদানি ব্যয় কমলেও আবার বাড়তে শুরু করেছে। এতে বাণিজ্য ঘাটতি আগামীদিনে আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ইপিজেডসহ রপ্তানি খাতে দেশ আয় করেছে দুই হাজার ৮৭২ কোটি ডলার, এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় করেছে চার হাজার ২৭৬ কোটি ডলার। সে হিসেবে ৯ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৪৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। দেশীয় মুদ্রায় ঘাটতির এ পরিমাণ ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা ধরে)।
এ সময়ের মধ্যে পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ আগের বছরের তুলনায় দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ বেশি আয় করেছে, বিপরীতে পণ্য আমদানি ব্যয় আগের বছরের চেয়ে ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বেড়েছে। দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের চাহিদা কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় আমদানি চাহিদাও বেড়েছে। তাই আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে স্বল্প পরিসরে। তবে দেশের প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ চাঙ্গা থাকায় বাণিজ্য ঘাটতি কম হয়েছে। প্রথম ৯ মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।
বিমা, ভ্রমণ ইত্যাদি খাতের আয়-ব্যয় হিসাব করে সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতি পরিমাপ করা হয়। করোনাকালে মানুষ ভ্রমণ কম করেছে। অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানি কম হওয়ায় বিমার খরচও কমে গেছে। ফলে সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কম হয়েছে। চলতি অর্থবছরের নয় মাসে এ খাতের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৯১ কোটি ডলার। গত অর্থবছর একই সময়ে তা ছিল ২৩৬ কোটি ডলার।
মহামারিতে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার প্রভাব সরাসরি পড়েছে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ওপরও। গত অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ২৪৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের এফডিআই পেয়েছিল বাংলাদেশ। একই সময়ে চলতি অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ২৫৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে সরাসরি মোট যে বিদেশি বিনিয়োগ আসে তা থেকে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মুনাফার অর্থ নিয়ে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তাকে নিট এফডিআই বলা হয়। আলোচিত সময়ে নিট বিদেশি বিনিয়োগও আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে ৯৪ কোটি ডলারে নেমেছে। গত বছর একই সময়ে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ১০৩ কোটি ডলার।
এদিকে, করোনা মহামারিতে বৈশ্বিক অর্থনীতির অবস্থা যখন নাজুক এমন পরিস্থিতিতেও দেশের অর্থনীতির অন্যতম সূচক বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স) উদ্বৃত্ত বাড়ছে। চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে চলতি হিসাবে ১২ কোটি ৫০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত রয়েছে। যা আগের অর্থবছরে একই সময়ে ঋণাত্মক ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ১০ লাখ ডলার।
এদিকে, সার্বিক রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারসাম্যেও (ওভারঅল ব্যালেন্স) ৬৯৯ কোটি ডলারের বেশি উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬২ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এই নয় মাসে ১ হাজার ৮৫৯ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। গত বছর একই সময়ে পাঠিয়েছিলেন ১ হাজার ৩৭৬ কোটি ডলার।
উল্লেখ্য, রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় যেটুকু বেশি, তার পার্থক্যই বাণিজ্য ঘাটতি। আর চলতি হিসাবের মাধ্যমে দেশের নিয়মিত বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি বোঝানো হয়। আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য নিয়মিত আয়-ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। এখানে উদ্বৃত্ত হলে চলতি লেনদেনের জন্য দেশকে কোনো ঋণ করতে হয় না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়।