গণমাধ্যমের অবদান ও রাষ্ট্র

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে এমন একটি প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যেখানে কোনো রাষ্ট্রের গণমাধ্যম সে রাষ্ট্র কিংবা সরকারের হস্তক্ষেপ অথবা যে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে। সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ, তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি  সাংবিধানিক অধিকার। জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। এই অধিকারে হস্তক্ষেপ ছাড়াই মতামত রাখা এবং কোনো গণমাধ্যমের মাধ্যমে তথ্য ও ধারণা অনুসন্ধান করা স্বাধীনতার সীমানা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।’ আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের ২-এর খাতে উল্লেখ আছে, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হইল’, অর্থাত্ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জায়গা যথেষ্ট পাকাপোক্ত, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে আলোচনা করতে হলে গণমাধ্যমের দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা চাই। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো, তথ্য সংগ্রহ করা এবং তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, সম্পদের অপব্যবহার, নাগরিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা প্রকাশে গণমাধ্যম প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এটি অন্যতম দায়িত্বও বটে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র— একটি অপরটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র অচল হয়ে পড়ে। কারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে শাসনব্যবস্থায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়, আর জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই হলো গণতন্ত্রের মূল। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনের কারণ তুলে ধরে স্থিতিশীলতা আনয়ন, বাধাহীন তদন্ত ও গবেষণা নিশ্চিত করে।

গণতন্ত্রের পাশাপাশি সুশাসন ও উন্নয়নের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও মুক্ত গণমাধ্যমের চর্চাকে পাশ কাটিয়ে উন্নয়ন ও অগ্রগতি কল্পনা করা সম্ভব নয়। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামোগত নয় বরং এটি একটি প্রক্রিয়া। নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের চর্চা কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের সহায়ক হতে পারে না। আধুনিক যুগে গণমাধ্যম একটি রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সমাজের ন্যায়-অন্যায়, অপসংস্কৃতি, কুসংস্কার, নাগরিকদের আশা, আকাঙ্ক্ষা, অধিকার, কর্তব্য, জনমত গঠন ও ভালো-মন্দের প্রতিফলন ঘটে গণমাধ্যমের কল্যাণে। একটি জাতির উন্নয়নের পথের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো গণমাধ্যম। একজন বিবেকবান এবং সচেতন সংবাদকর্মী একটি জাতির জন্য অন্যতম পথপ্রদর্শক, যার সাথে সহায়ক ভূমিকা পালন করে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম। অবহেলিত, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কিংবা জনপদের সমস্যা, প্রতিকার এবং সম্ভাবনা লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরা, অনগ্রসর ও অসচেতন জনগোষ্ঠীর চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটানো, তাদের জনশক্তিতে পরিণত করা, নতুন নতুন, চিন্তা, ধারণা, উদ্ভাবনী শক্তির প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে জাতিকে আলোর পথ দেখানোর সহায়ক ভূমিকা পালন করে গণমাধ্যম। তাই একটি দেশের গণমাধ্যমকে পাশ কাটিয়ে উন্নতির চিন্তা পণ্ডশ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়।

এদেশের স্বাধীনতার পেছনে রয়েছে গণমাধ্যমের ঐতিহাসিক অবদান, যা বহির্বিশ্বের জনমত গঠনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, উনসত্তরের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান এবং সত্তরের নির্বাচন—প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনার পেছনের অসামান্য অবদান রয়েছে গণমাধ্যমের।

বর্তমানে উন্নয়ন বলতে বেশির ভাগ সময়ই বলা হয় অবকাঠামোগত  উন্নয়নের কথা, যা উন্নয়নের যথার্থতা বহন করে না। বরং অবকাঠামো সৃষ্টি উন্নয়নের সহায়ক মাত্র। কার্যত উন্নয়ন হচ্ছে মানব উন্নয়ন, মানুষের অবস্থা ও জীবনমানের উন্নয়নের একটি সামগ্রিক অবস্থা। আবার শুধু আয়ের ব্যবস্থাকে উন্নয়ন বলা যায় না বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা উন্নয়নের অন্যতম মানদণ্ড। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রয়োজন আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, উদারনৈতিক গণতন্ত্র, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ—চর্চার মাধ্যমে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা যায় এবং তা বাস্তবায়নের পেছনে অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে গণমাধ্যম। গণমাধ্যম স্বাধীন হলে বাকস্বাধীনতা থাকে, যার ফলে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এবং গণতন্ত্রের চর্চা বহাল থাকে। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় জাতি-ধর্ম-দলনির্বিশেষে সবাইকে একযোগে কাজ করে যেতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়