রাজধানীর দক্ষিণখান সরদার বাড়ি জামে মসজিদের সেপটিক ট্যাংক থেকে আজহারুল (৪০) নামে এক গার্মেন্টসকর্মীর ছয় টুকরা লাশ উদ্ধারের ঘটনার দায়ের করা মামলায় মসজিদের ইমাম আব্দুর রহমান ও নিহতের স্ত্রী আসমা বেগমকে পৃথকভাবে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল বুধবার দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণখান থানার এসআই অনুজ কুমার সরকার প্রত্যেককে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে আসামিদের ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করেন। মহানগর হাকিম নিভানা খায়ের জেসি রিমান্ড শুনানি শেষে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মঙ্গলবার ভোরে মসজিদের সেপটিক ট্যাংক থেকে আজহারুলের লাশ উদ্ধারের পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে র্যাব আব্দুল্লাহপুর থেকে নিহতের স্ত্রী আসমা বেগমকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে নিহতের ছোট ভাই মোহাম্মদ হাসান বাদী হয়ে আসমা বেগম ও সরদার বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম আব্দুর রহমানকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
আসমার পরিকল্পনায় খুন
মঙ্গলবার রাতে আসমা বেগমকে গ্রেফতারের পর র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসমা বেগম নিজেকে এই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে স্বীকার করেন। বলেন, আসমার নির্দেশেই ইমাম পরিকল্পিতভাবে তার স্বামী আজহারুল ইসলামকে হত্যা করে।
জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি ইমামের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। প্রেমের সম্পর্ক গভীর করার জন্য তার স্বামী ও চার বছরের সন্তানকে কোরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য ইমামকে বাসায় আসতে দেন। এভাবেই তাদের পরকীয়া সম্পর্ক চলছিল। কিন্তু মার্চ মাসে আজহারুল বিষয়টি টের পেয়ে যান। এর পরই আজহার বাসা পরিবর্তন করে দক্ষিণখানের মধুবাগ এলাকার হাজি মার্কেটের সামনে বাসাভাড়া নেন। এতেও চিড় ধরেনি আসমা-ইমামের সম্পর্কে। নিয়মিত দেখা হতো তাদের। তারা কথোপকথনের জন্য পৃথক মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন। স্বামী আজহারুল গার্মেন্টসে চাকরি করতে যাওয়ার পর আসমা সারা দিন মোবাইল ফোনে ইমামের সঙ্গে কথা বলতেন। এ বিষয়টি তার ছেলে স্বামীকে জানিয়ে দেয়। এরপর থেকে আসমা তার স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকেন। এ নিয়ে তিনি ইমামের সঙ্গে কথাও বলেন। ইমামকে ভাড়াটিয়া কিলার গ্রুপ ঠিক করতে বলেন। কিন্তু ইমাম তাকে জানান যে, ভাড়াটিয়া কিলার গ্রুপ দিয়ে হত্যা করলে ঘটনা যে কোনো সময় ফাঁস হয়ে যেতে পারে। এ কারণে তিনি নিজেই হত্যা করার কথা বলেন।
ঈদ উদ্যাপন করতে আজহারুল স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে তার নিজ বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে চলে যান। তখন আসমা বেগম পরকীয়ার বিষয়টি নিয়ে নিজেই তার স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করে ঝগড়া বাধিয়ে দেন। আসমার পরিকল্পনা ছিল, তার স্বামী ঢাকায় গিয়ে ইমামের সঙ্গে দেখা করলে ইমাম তখন তাকে খুন করবে।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, ঈদের পর ১৯ মে আজহারুল তার স্ত্রী ও সন্তানকে টাঙ্গাইলের বাড়িতে রেখে ঢাকায় আসেন। সারা দিন গার্মেন্টসে ডিউটি করে সন্ধ্যার পর আজহারুল চলে যান সরদার বাড়ি জামে মসজিদে ইমামের সঙ্গে দেখা করতে। ঐ দিন এশার নামাজ মসজিদে আদায় করার পর বিষয়টি নিয়ে আলাপ করার জন্য তিনি ইমাম আব্দুর রহমানের সঙ্গে তার ঘরে যান। সেখানে স্ত্রীর পরকীয়ার বিষয় নিয়ে ইমামের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ইমাম ঘরে রাখা গরু জবাই করার ছুরি দিয়ে আজহারুলের শরীরে দুটি আঘাত করেন। আজহারুল ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে ইমাম তার গলায় উপর্যুপরি কোপ দেন। এতে আজহারুলের মৃত্যু হয়। পরে ইমাম রাত ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত আজহারুলের মৃতদেহ ছুরি ও চাপাতি দিয়ে কেটে ছয় টুকরা করেন। ফজরের নামাজের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেই ইমাম মসজিদের নিচ তলায় সেপটিক ট্যাংকে টুকরোগুলো ফেলে দেয়। এরপর নিজের ঘর এবং সেপটিক ট্যাংকের আশপাশের রক্তের দাগ পরিষ্কার করেন। এরপর ট্যাংকের ঢাকনার ওপর দুটি সিমেন্টের বস্তা রেখে দেন ইমাম আব্দুর রহমান।