পাঠ করলেই ঘোষক নয়; লাশ হলেই শহীদ নয়—এই অসাধারণ রাজনৈতিক কবিতার কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে পত্র-পত্রিকার অফিসে ঘুরে বেড়াই। কেউ কেউ বাঁকা দৃষ্টিতে তাকালেও কারো কারো সুদৃষ্টি অর্জন করি। যাঁদের প্রশ্রয় পাই—কবি বেলাল চৌধুরী তাঁদের একজন। বেলাল ভাই ভারত বিচিত্রা অথবা সচিত্র সন্ধানী পত্রিকার জন্য হাবীবুল্লাহ সিরাজীর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মোমশিল্পের ক্ষয়ক্ষতি’ রিভিউ করার জন্য দিলেন। বইটি হাতে পেয়ে গোগ্রাসে পড়ি। আলোচনার জন্য প্রস্তুতি নিই। খুব কঠিন লাগে সিরাজীর কবিতা। কী কাঠখোট্টা, রসকষহীন! এক লাইন বুঝি তো দুই লাইন বুঝি না। তবু নিজের সাথে যুদ্ধ করে কিছুটা কৌশল করে, কিছুটা গোজামিল দিয়ে লিখলাম। ছাপাও হলো। সেই সূত্র ধরেই সিরাজী ভাইয়ের সাথে পরিচয়। প্রথম দিনই প্রশ্ন করেছিলাম—ইসমাইল হোসেন সিরাজী আপনার কী হন?
সিরাজী ভাই যে মজার মানুষ, তা সেদিনই টের পেয়েছি তাঁর জবাবে। নির্দ্বিধায় জবাব দিয়েছেন, আমার নানা।
ইতোমধ্যে আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত একটি পাক্ষিক পত্রিকায় যোগ দিয়েছি। অফিস সচিবালয়ের ইডেন বিল্ডিংয়ের চার তলায়। পত্রিকার সম্পাদক আরেফিন বাদলের কাছে প্রায় সব লেখক আসতেন।আড্ডা জমত। সিরাজী ভাই এসে আমাকে খুঁজতেন। এবার হাতে তুলে দিলেন— ‘মধ্যরাতে দুলে ওঠে গ্লাশ’; মাতাল গ্লাস। মজা করে প্রশ্ন করি—বেলাল ভাইয়ের ‘যাওয়ার আগে আরেক চুমুক’ বইয়ের নামের সাথে মিলিয়েই এই নাম রেখেছেন?
—হুম, আমরা তো একসাথেই খাই।
খ]
সিরাজীর কবিতা ছিল একেবারে ভিন্ন ধাঁচের। তিনি কাউকে অনুসরণ বা অনুকরণ করে কবিতা লিখেননি। তাঁর কবিতার স্টাইল ছিল সিরাজীয় স্টাইল। এই স্বাতন্ত্র্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বজায় রেখেছেন।
ষাট দশকের কবিদের প্রত্যেকেরই আলাদা ভাষাশৈলী ছিল। রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, আসাদ চৌধুরী, সিকদার আমিনুল হক, শামসুল ইসলামদের কবিতার উপস্থাপনা বা প্রবণতার পার্থক্য পাঠক সহজেই অনুধাবন করতে পারেন। এবং সিরাজীও গতানুগতিক ধারার বাইরে কবিতা রচনা করেছেন। তবে তা দুর্বোধ্য বা জটিল নয়। তাঁর কবিতায় কাব্যমেধা, কবিতার বিষয় ও ভাষা, কবিতার উচ্চতা এবং গভীরতা, আধুনিকতা, সৌন্দর্য, নির্মাণকৌশল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেকোনো সচেতন পাঠক খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারেন।
সহজ-সরল-তরল কবিতা তিনি লিখেননি। তাঁর কবিতা রহস্যময়, অন্তর্গূঢ়, বিমূর্ত এবং প্রতীকী। তাঁর কবিতা উন্মুক্ত নয়, আড়াল। তা উন্মোচন করতে হয়। এই কাজটি সিরাজী ভাই সিদ্ধহস্তেই করেছেন এবং তা সার্থকভাবেই করেছেন। ফলে তিনি যতটা পাঠকের কবি, তার চেয়ে বেশি কবিদের কবি।
কবিতার ঊদ্ধৃতি না দিলেও সার্বিকভাবে বলা যায়, প্রতিনিয়ত তিনি তাঁর কবিতার বাঁক পরিবর্তন করেছেন।
যদি তাঁর কাব্যগ্রন্থের নামকরণের দিকে নজর দিই, তাহলেও দেখব একটু ব্যতিক্রমধর্মী। যেমন— ‘মোমশিল্পের ক্ষয়ক্ষতি’, ‘মধ্যরাতে দুলে ওঠে গ্লাশ’, ‘নোনা জলে বুনো সংসার’, ‘পোশাক বদলের পালা’, ‘হ্রী’, ‘ভুলের কোনো শুদ্ধ বানান নেই’, ‘কবিরাজ বিল্ডিংয়ের ছাদ’, ‘বেদনার চল্লিশ আঙুল’, ‘মিথ্যে তুমি দশ পিঁপড়ে’ তাঁর কবিতার মতোই আলাদা।
গ]
সিরাজী ভাই আশি-নব্বই দশকে প্রায়ই ঢাকা থেকে কিছুদিনের জন্য ‘নেই’ হয়ে যেতেন। কারণ, কর্মসূত্রে মধ্যপ্রাচ্যে এবং মালয়েশিয়ায় চলে যেতেন। ফিরে এলেই জমে উঠত আমাদের আড্ডা। এখানে, সেখানে।
আমি কানাডায় আসার পর বললেন—‘দুলাল, আমি বিদেশে চাকরি করতে গিয়ে ক’মাসে হাঁপিয়ে উঠি আর আপনারা বছরের পর বছর কীভাবে থাকেন!’
এই প্রশ্নটা করেছিলেন কানাডায় বেড়াতে এসে। বড়ো মেয়ে অর্চি কানাডায় থাকে। তাকে দেখার জন্য বছরে অন্তত একবার টরন্টো আসতেন। এসেই কল দিতেন—দুলাল, এসে গেছি। কবে দেখা হবে?
ফলে প্রতিবারই পানাহার হতো ধুমছে। কখনো বারে, কখনো আহমদের বাসায়। আড্ডা হতো আমার মেসি স্কয়ারে। তিনি ভাত খেতেন হিসেব করে, কিন্তু পানাহার করতেন বেহিসেবির মতো।
সেই আড্ডার স্মৃতিগুলো ধরে রেখেছি ‘সিরাজী সিরিজ’ কবিতায়। কবিতাগুলোতে তাঁর কানাডায় আড্ডা এবং তাঁর কবিতার, তাঁর ভালোলাগার এবং বেদনার কিছু চিত্র পাওয়া যাবে। এর বাইরেও অনেক অপ্রকাশিত কথা আছে, বেদনা আছে। যেমন—প্রয়াত মাহাবুবুল হাসান নীরুর সাথে অর্চির বিয়ে এবং বিচ্ছেদ, শরীরের ভেতর নানান রোগের বাসা, (তার মধ্যে ক্যানসারের বিষয়টি পরিবারের সদস্য ছাড়া কাউকেই জানাননি।) সেজন্য জোরা ভাবীর বিবিধ নিষেধাজ্ঞা, টরন্টোর কমিউনিটির নোংরা পলিটিক্স—এসব বিষয় প্রাণ খুলে শেয়ার করতেন।
টরন্টোর বাংলা বইমেলায় সিরাজী ভাইকে প্রধান অতিথি করা হলো। সকাল ১০টায় মেলা উদ্বোধনীর দিন তিনি প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি হয়ে বসে ছিলেন মেয়ের বাসায়। বাসাটা টরন্টোর বাইরে, ঘণ্টা দেড়েকের ড্রাইভ। তাঁকে কেউ গিয়ে নিয়ে আসবে। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে যায়। কিন্তু কেউ তাঁকে আনতে যায়নি। কারণ, মেলার আয়োজক বিনা খরচে নিউ ইয়র্ক থেকে আগত ‘আরো দুই দামি’ প্রধান অতিথি এবং বিশেষ অতিথি যথাক্রমে কাইয়ুম চৌধুরী ও সুবীর চৌধুরীকে পেয়ে গেছেন। তাই তিনি বাদ। সিরাজী ভাই অপমানে মন খারাপ করে পাঞ্জাবি খুলে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন!
পরের বছর সেই বইমেলায় আবারও সিরাজী ভাই প্রধান অতিথি। এবার প্রধান অতিথির কাজ সেরে কল দিলেন। সেদিন ছিল রোববার। আমার ছুটি।
আমার বাসা থেকে ৯ ডোজ রোডের রয়েল কানাডিয়ান লিজিওন হলের অনুষ্ঠানস্থলের দূরত্ব হাঁটাপথ অথবা দশ টাকার রিক্সা ভাড়া। যদিও এখানে রিক্সা নেই। তিনি মেলাপর্ব সেরে হল থকে বেরিয়ে এলেন আড্ডার আকর্ষণে। কিছুক্ষণ ড্যানফোর্থের ফুটপাতে, কিছুক্ষণ মেইন স্ট্রিটের টিমহর্টন্সে। তখন বললেন, দুলাল, অনেক গরম। বিয়ার পান করতে হবে।
গেলাম হলের নিচে অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের একটি বারে। পানাহারের একপর্যায়ে জানতে চাইলাম— গতবার আপনাকে নিয়ে নাটক করল তারপরও এবার এলেন?
—হা-হা-হা। ক্ষমাই মহত্ত্বের লক্ষণ। আমাকে ওদের প্রয়োজন। অপেক্ষা করুন, নাটকের আরো দৃশ্য বাকি আছে!
তাঁর এই রহস্যময় মারফতির অর্থ পরের বছর প্রমাণিত হলো।
পরের বার শুধু সিরাজী ভাইকেই নয়; সংস্কৃতি সচিবকেও বিমান ভাড়া দিয়ে বইমেলায় আনা হলো! কারণ, তখন তিনি বাংলা একাডেমির মহা পরিচালক!
ঘ]
সিরাজী ভাই বাংলা একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর দুটি বিষয়ে ফোন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একশো বই করবেন। সেই প্রকল্পের জন্য একটি ভিন্ন ধরনের পাণ্ডুলিপি চাইলেন। আরেকটি হচ্ছে— পুরস্কার সংক্রান্ত।
গত বছর ১৫ ডিসেম্বর ভোর রাতে সিরাজী ভাইয়ের ফোন কল। খুব আবেগ আর আন্তরিকতায় নাটকীয় কণ্ঠে বললেন, ‘দুলাল, কেমন আছেন ভাইটি আমার! একটি সুখবর আছে! এখনি দেবো? নাকি আপনি ঘুম থেকে উঠলে আস্তে ধীরে আনন্দের সংবাদটি জানাবো?’
ঘুম জড়ানো কণ্ঠে আমি বললাম, ‘না না। এখনি বলেন।’ সিরাজী ভাই অত্যন্ত উচ্ছ্বাসের সাথে বললেন, ‘কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—আপনাকে আর হাসান ফেরদৌসকে এবার সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হবে। তাই আপনার সম্মতি দরকার!’
আমি কিংর্তব্যবিমূঢ়! বললাম, ‘সিরাজী ভাই, প্রথমত দুই দুই বার জামান খানের গরম ভাত প্রত্যাখ্যান করেছি। আর আপনি সেই একই বাসি-পচা-পান্তা আবারও সাধছেন! আমার সম্পর্কে আপনার এই ধারণা!’
—দুলাল, দুলাল, ভাইটি আমার, রাগ করবেন না। এটা এখন প্রবাসী পুরস্কার নয়। এটা একাডেমির একমাত্র আন্তর্জাতিক পুরস্কার। উইলিয়াম রাদিচেকেও ওয়ালিউল্লাহ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে!
—সিরাজী ভাই, দাদাকে আদা চেনাচ্ছেন? ছিঃ!
—দুলাল, দুলাল, আপনি রাগ করতাছেন! আপনি না নিলে একটা চিঠি দিয়ে জানান।
—আপনি চিঠি দিন। আমি জবাবে প্রত্যাখ্যান করব। যদিও মৌখিকভাবে প্রত্যাখান জানিয়ে দিলাম।
সিরাজী ভাইয়ের সাথে ঢাকা-টরন্টোর অনেক ছবি আছে, প্রচুর স্মৃতি আছে; আছে তাঁর কবিতা, সাহিত্যকর্ম। শুধু নেই হাবীবুল্লাহ সিরাজী।