কোর্ট বিল্ডিংয়ের মেইন গেইট হাঁ করে খোলা। বিকেলবেলায় সাধারণত মূল এ ফটকটি তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। সরকারি অফিসের বিভিন্ন পয়েন্টে তালা মেরে দেওয়ার দায়িত্ব যার সে ডিউ টাইমে এ কাজটি করে থাকে। এ কর্মটি যার ওপর বর্তায় সে একজন নাইট গার্ড। নাম তার ওমর ফারুক। আমি যখন আদালতি কার্যক্রম শেষ করে বের হব তখন এ দৃশ্য দেখি। অটোরিক্সা খুঁজতে আশপাশে তাকাতেই আমার দৃষ্টিগোচর হয়, নাইট গার্ড ওমর ফারুক তার প্রিয় বাইসাইকেলটি একটি দেয়ালের পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে বাইসাইকেলের বডির কসরত করছে।
একটু এগিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার সাইকেলের কী হয়েছে?’
ওমর ফারুক বেশ বিরক্ত হয়ে জবাব দিল, ‘দেহুইন স্যার, সারা রাস্তা বালা গেল আর অফিসের কাছে আইতেই সাইকেলের চেইন আটকে গেল।’
আমি তাকে বললাম, ‘কোথাও থেকে সারিয়ে আনো।’
সবজান্তার ভঙ্গিতে ওমর ফারুক বলল, ‘এহন গেলে আমার চাকরি থাকতো না।’
আমি বললাম, ‘কেন, কারণ কী?’
ও বলল, ‘আর কইয়েন না। এনডিসি স্যারে জরুরি খবর দিছে।’
‘জরুরি কোনো ব্যাপার আছে?’
‘হেইডা কইবার পারতাম না, তবে স্যারের বাসায় মনে অয় দুধের সংকট পড়ছে।
‘ও তুমি তো আবার সাহেবদের বাড়িতে দুধ সাপ্লাই দাও।’
ওমর ফারুক দুটো অস্ট্রেলিয়ান গাভী পালন করে। দুধ বিক্রি তার অপশোনাল পেশা। অফিসের ডিউটি বিকেল পাঁচটা থেকে পরদিন সকাল আটটা পর্যন্ত। গাভী পালন তার একটি শখ বলা যায়। বেশ কিছুক্ষণ কসরতের পর ওর সাইকেলটি ঠিক হয়। এবার বেশ তাড়াহুড়া শুরু করে ওমর ফারুক। বলে, ‘দেরি করা যাইতো না। স্যারের লগে দেহা কইরা আবার রাইত পাহারা দেওন লাগবো।’
আমি বললাম, ‘রাতকে তুমি পাহারা দেবে নাকি রাত তোমাকে পাহারা দেবে?’
ওমর ফারুক বিজ্ঞের মতো বলল, ‘না স্যার, রাইত আমরারে পাহারা দেয় না। আমরা রাইতেরে পাহারা দেই। নাইলে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বাইড়া যাইতো।’
‘তোমার এ কথাটি তো আমি বুঝতে পারলাম না।’
‘দেহুইন স্যার, সারাডা রাইত অরক্ষিত থাহে। এই কারণে রাইতকেই আমরার পাহারা দেওন লাগে।’
ওর কথায় আমি বেশ পুলকিত হলাম। বললাম, ‘কীভাবে তোমরা রাতকে পাহারা দাও, আমাকে বলবে?’
ওমর ফারুক বলল, তাইলে আপনের রাইত দশটার দিকে আমার এইহানে আওন লাগবো, আমি কয়েকজন স্যারের বাসায় চিঠি দিবার যাইবাম। হেই সময় আপনেরে আমি রাইত দেহাইবাম। তাইলে আপনে বুঝবার পাইবাইন।’
আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, আজ রাতে আমি আসব, ওমর ফারুকের রাতকে পাহারা দেওয়ার বিষয়টা আমার অবলোকন করতে হবে।
রাত দশটা বাজার ঠিক আগ মুহূর্তে আমি ওমর ফারুকের ডেরায় হাজির হলাম। সিঁড়িকোঠার একপাশে রাতের শয্যার পরিপাটি কাজে ব্যস্ত ছিল। আমাকে দেখে সালাম দিয়ে একটি ছোট প্লাস্টিকের চেয়ার এগিয়ে বসতে বলে। ফ্লোরে আগে থেকেই তোষক বিছানো ছিল। এক কর্নার থেকে চাদর এনে বালিশ আর পাতলা একটি কম্বল বিছানার ওপর রাখে।
আমি ওমর ফারুককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘শোবার আয়োজন এখনি করে ফেলছো?’
ওমর ফারুক সহাস্যে বলে, ‘না স্যার। অফিসের কাজে তো বাইরে যাইতেই অইতেছে। কয়েকজন স্যারের বাসায়, মন্ত্রণালয়ের চিঠি পৌঁছাইয়া দেওন লাগবো। কোন সময় ফিরবাম তার কি ঠিক আছে! এই লাইগ্যা আমার বিছানাডা গুছাইয়্যা রাইখ্যা গেলাম।
ওমর ফারুকের চিন্তাশৈলী দেখে আমি বেশ অবাক হলাম। বোঝা যাচ্ছে, সরকারি এম.এল.এস.এস পদে নৈশপ্রহরী হিসেবে চাকরি করলেও জ্ঞানবুদ্ধি মোটামুটি ভালোই রাখে। অফিসের বড়ো কর্তাদের বাসায় বাসায় জরুরি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি পৌঁছে দেবার দায়িত্ব তার না হলেও যেকোনো কারণে অফিসিয়াল এ ধরনের দায়িত্বও তার পালন করতে হয়। আমাকে নিয়ে সে তার বাইসাইকেলে করে বের হতে চাইলে আমি না করলাম এবং সিদ্ধান্ত নিলাম হেঁটেই রাতপাহারাটা অবলোকন করব।
হাঁটতে হাঁটতে যখন গোল পুকুর পাড় এলাকায় পৌঁছালাম তখন রাতের পরিবেশ বেশ নিস্তব্ধ। গোল চত্বরের পাশেই একটি পূজামণ্ডপ, মন্দিরের সম্মুখভাগে এটি। মণ্ডপের সামনে বিবর্ণ কিছু ফুলের তোড়া, একটু সামনেই চতুষ্কোণ ঘেরাও দেওয়া একটি স্মৃতিফলক। ফলকে লেখা আছে, ‘স্বর্গীয় শাওন ভট্টাচার্য-এর শ্রদ্ধা স্মারক।’
বেশ কিছুদিন আগের ঘটনাটা আমিও কম-বেশি শুনেছি। এখানে দুর্গাপূজার বিসর্জনের রাতে আরতি দেওয়ার সময় একটা মার্ডার হয়। শুনেছিলাম ঘটনাটি আরতির সময় ধাক্কাধাক্কিকে কেন্দ্র করে দুই বন্ধুর মধ্যে হাতাহাতির একপর্যায়ে মাহফুজ নামের একজন চাকু দিয়ে শাওন ভট্টাচার্যকে স্টেপ করে!
ওমর ফারুক হঠাত্ আমাকে দাঁড় করিয়ে একটি প্রশ্ন রাখে, ‘একটা বিষয় খেয়াল করছুইন স্যার?’
আমি অবাক হয়ে বলি, ‘কী বিষয়ে বলছো, তুমি?’
ও বলে, ‘এইহানে খুনডা অওয়ার পর থাইক্কা রাইতের বেলায় এই জায়গা একবারে নিস্তব্ধ থাহে।
আমি বলি, ‘হুম।’
‘আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করছুইন স্যার? স্মৃতিফলকের চাইরদিকে চাইরটা কুত্তা পাহারা দিতাছে!’
‘কুকুর তো পাহারা দিতেই পারে!’
‘না স্যার, এই কুত্তা গুলাইন রাইতেরে পাহারা দিতাছে যাতে কেউ রাইতেরে ডিস্টার্ব করতে না পারে।’
‘তুমি তো উপমা ভালোই দিতে পারো।
আমরা এ স্থানটি পরিবর্তন করলাম, নিস্তব্ধ রাতে পাখ-পাখালির ডাক আর কুকুরের উপস্থিতি ছাড়া অন্য কিছুর সরবতা কোনোভাবেই টের পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রকৃতি মনে হয় তার নিয়তির লাগাম টেনে ধরেছে! এমন ঘুমকালো রাতে বোঝা যাচ্ছে প্রকৃতি নীরব সাক্ষী হয়ে রাতকে পাহারা দিচ্ছে যাতে কোনো কিছুতে ছন্দপতন না ঘটে।
আওয়াজটা দূর থেকে এলেও রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে আমাকে চমকে দেবার অবস্থা করেছে। ঠাহর করতে পারছি না, কোত্থেকে কী হচ্ছে। গাঙ্গিনার পাড় ট্রাফিক মোড়ে আসতেই ওমর ফারুক পেছন থেকে আমাকে টেনে ধরে, মনে হয় সে একটু জিরিয়ে নিতে যাচ্ছে। আমি থমকে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি আমাকে থামালে কেন?’
ওমর ফারুক বলে, ‘একটু খাড়ুইন স্যার, এইহানে দেহার মতো ব্যাপার আছে।’
‘ঘটনা কী বলো তো!’
‘সামনে এক মাতাল লোক চিল্লাচিল্লি করতাছে।’
আমরা ট্রাফিক আইল্যান্ডের কাছাকাছি যেতেই একটি লোককে দেখা যায়। প্রায় অর্ধউলঙ্গ অবস্থায় খিস্তি আউড়াচ্ছে, আছে কোনো (...) পুত আমার সামনে? বাংলার নবাব সিরাজউদ্দোলা না; বাংলার নবাব আমি। আছে কোনো (...) পুত?’
লোকটি এরপর দু’হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে নিজের বুকে জোরসে আঘাত করতে থাকে। আবার গান ধরে, আমি এক দুরন্ত যাযাবর। পথেই আমার ঘর।
এখানে থাকা যাবে না। ওমর ফারুককে নিয়ে এগুতে শুরু করলাম। একটু পর সে নীরবতা ভাঙে এবং বলে, ‘কিছু বুজলাইন স্যার?’
আমি জবাব দিলাম, ‘আমি ঠিক বুঝলাম না! তুমি কিছু বুঝতে পেরেছো?’
‘এই মাতাল লোকটা রাইতেরে ডিস্টার্ব করতাছে।’
‘কী রকম?’
‘এই যে দেহুইন, চিল্লাচিল্লি কইরা রাইতের নীরবতা ভাঙতাছে। রাইতেরে কেউ ডিস্টার্ব করলে আমরার পাহারা দেওন লাগে। নাইলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাইবো গা। রাইতেরে কেউ জ্বালাতন করুক এইডা আমরা চাই না।’
ওমর ফারুকের এসব জ্ঞানের কথায় আমার স্পষ্ট ধারণা হলো প্রকৃতিকে যেমন তার নিজস্ব নিয়মে চলতে দেওয়া উচিত তেমনি কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার যাতে রাত না হয় এটাও ভাববার বিষয়। বাকি পর্বের জন্য আমরা সামনে এগুতে থাকি।