বিমানে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা

কখনো তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, কখনো বিমানের জিএম। সঙ্গে থাকত আধুনিক পোশাক পরিহিত কেবিন ক্রু। টাকা দিলেই তিনি বিমানে চাকরি দিতে পারেন। বেশ কয়েক জনকে বিমানে চাকরিও দিয়েছেন। সেটিকে সম্বল করে তিনি বিমানের বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়ার নাম করে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এই ভুয়া ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বা ভুয়া জিএমের নাম শামীম আহমেদ ওরফে মোস্তফা মনির ওরফে মোশারফ। পরিচয়ে কখনো আবার মোস্তফা মনির বা  মোশাররফ। বুধবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে শামীম আহমেদসহ এই চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করে সিআইডি। গ্রেফতারকৃতদের অপর তিন জন হলেন—শামীম আহমেদের বান্ধবী তানজীলা সুলতানা সমাপ্তি, চাকরিচ্যুত সেনাসদস্য বজলুল রশিদ ও শরিফুল ইসলাম। তানজীলা সুলতানা সমাপ্তি নিজেকে পরিচয় দিতেন বিমানের এয়ার  হোস্টেস বা  কেবিন ক্রু হিসেবে। বজলুল রশিদ এক সময় র্যাবে কর্মরত ছিলেন। ২০০৬ সালে যাত্রাবাড়ীতে একটি কাভার্ড ভ্যানে ডাকাতি করার সময় পুলিশের হাতে বজলুল রশিদ গ্রেফতার হন। ঐ ঘটনায় বজলুল রশিদ সাত বছর জেল খেটে বের হয়ে প্রতারক শামীম আহমেদের দলে যোগ দেন।

গতকাল মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক বলেন, শামীম নিজেকে বিমানের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, আবার কখনো এমডি দাবি করতেন। চক্রটি বিমানে চাকরি  দেওয়ার নাম করে অনেকের কাছ থেকে ১৩ থেকে ১৭ লাখ টাকা করে আত্মসাত্ করে চাকরি না দিয়ে প্রতারণা করে।

সিআইডি জানায়,  এই প্রতারক চক্রের সদস্যদের বাড়ি রংপুর জেলায়। চক্রের সদস্যরা বিমানের নিয়োগের সার্কুলার হওয়ার পর তাদের এলাকার লোকজনকে চাকরি দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। তাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য তারা নিয়োগপ্রত্যাশীদের ভুয়া পরীক্ষা নেয় এবং তাদের সবাইকে ফেল করিয়ে দেয়। পরে ফেল করাদের নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেন।

বিমানের একটি বিভাগে সহকারী পরিচালকের চাকরির জন্য শামীমকে ২০১৯ সালে সাড়ে ১৩ লাখ টাকা দিয়েছেন এক ব্যক্তি। তিনি প্রতারিত হয়ে এ বিষয়ে একটি মামলা করেন। সেই মামলায় আসামিদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

সিআইডি জানায়, দীর্ঘদিন আগে শামীম একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। সেই সূত্রে বিমানবন্দরের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় ছিল।  সেখান থেকেই তিনি প্রতারণার কৌশলগুলো জেনে চাকরি ছেড়ে চাকরি দেওয়ার প্রতারণা করেন। গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে মোবাইল এবং ভুয়া নিয়োগপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বিমানে চাকরি দেওয়ার নামে প্রায় ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে সিআইডির কাছে তথ্য রয়েছে।

তবে শামীম সিআইডির কাছে জানান, বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার  যোগাযোগ রয়েছে। এর আগে তিনি বেশ কয়েক জনকে বিমানের কেবিন ক্রু, এক্সিকিউটিভ অফিসার, সিগন্যালম্যান, চেকিং অফিসার, এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার পদে ঘুষের বিনিময়ে চাকরি দিয়েছেন। তবে এবার দিতে পারেননি।

বিমানের কথিত এয়ার হোস্টেস তানজীলা নিজেকে একজন টিকিটিং অফিসার বলে দাবি করেন। তিনি কখনো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, আবার কখনো রিজেন্ট এয়ারওয়েজের টিকিটিং অফিসার বলে দাবি করেন। তিনি শামীমের সঙ্গে যোগসাজশ করে তার এলাকার লোকজনকে চাকরি দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নিতেন। অবিবাহিত তানজীলাকে ঢাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে শামীমের সঙ্গে থাকা অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়।

সিআইডি জানায়, গ্রেফতার হওয়া তৃতীয় জন বজলুর রশিদ সেনাবাহিনীর কর্পোরাল হিসেবে র?্যাবে কর্মরত ছিলেন। ২০০৬ সালে যাত্রাবাড়ীতে একটি কাভার্ড ভ্যান থামিয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকার মালামাল ডাকাতি করে। ঐ ঘটনায় বজলুর সাত বছর জেল খেটে প্রতারক চক্রের সঙ্গে যোগ দেন। প্রতারক চক্রে বজলুর রশিদ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বডিগার্ড দাবি করতেন। সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক বলেন, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে বিমান বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের যোগসাজশের আভাস পাওয়া গেছে। আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি।