গলায় দা চালিয়ে ঢাবি ছাত্র হাফিজুরের আত্মহত্যা

ডিবি’র তদন্তে ভয়ংকর মাদক এলএসডির সন্ধান গ্রেফতার ৩

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে ডাব বিক্রেতার দা দিয়ে নিজ গলায় আঘাত করে হাফিজুর রহমান নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে তার মৃত্যুর সঙ্গে ভয়ংকর মাদক এলএসডির  (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড) যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এলএসডি সেবনে হ্যালুসিনেশন হয়। প্রচণ্ড উত্তেজনার সঙ্গে এই মাদক চিন্তা, অনুভূতি ও পারিপার্শ্বিক চেতনাকে পরিবর্তন করে দেয়। ধারণা করা হচ্ছে, এলএসডি সেবন করেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে আত্মহত্যা করেন ঢাবি শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান। তার কয়েক জন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এলএসডির তথ্য পাওয়া যায়। এ ঘটনায় বুধবার রাতে রাজধানীর ধানমন্ডি ও লালমাটিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে এলএসডিসহ হাফিজুরের তিন জন বন্ধুকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) রমনা বিভাগ। গ্রেফতারকৃতরা হলো—নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাদমান রূপল, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র আদিব আশরাক ও আসহাব ওয়াদুদ তুর্জ। গতকাল বৃহস্পতিবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান, ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার। এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, গতকাল তাদেরকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়। রবিবার তাদের রিমান্ড শুনানি হবে।

ডিবি কর্মকর্তা হাফিজ আক্তার জানান, আত্মহত্যাকারী হাফিজুর রহমানের বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাবির বহিষ্কৃত ছাত্র সাদমানকে ধানমন্ডি থেকে আটক করা হয়। সে বর্তমানে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএর শিক্ষার্থী। সাদমানকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সে নেদারল্যান্ডস থেকে মেইল ও চিঠির মাধ্যমে ডাক টিকিটের মতো দেখতে এই মাদক ৮০০-১০০০ টাকায় একটি ব্লট কেনে। নেদারল্যান্ডসের এক নাগরিকের সঙ্গে টেলিগ্রাম অ্যাপসে যোগাযোগ করে পেপ্যালের মাধ্যমে মাদকের টাকা পাঠাত এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সংগ্রহ করত। ‘আপনার আব্বা’ নামে সাদমানের একটি ফেসবুক আইডি রয়েছে। সে ‘Better brawry and beyond’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ পরিচালনা করে, যেখানে প্রায় ১ হাজার সদস্য রয়েছে। সাদমান, আসহাব ও আদিব এই তিন জন মিলে ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে এলএসডি বিক্রি করত। তারা গাঁজা পাতার নির্যাস দিয়ে কেক তৈরি করেও অনলাইনে বিক্রি করত। সাদমানের দেওয়া তথ্যমতে, আসহাব ও আদিবকে আটক করা হয়।

এলএসডি সেবন করলে যে কারো মাথা ভার হয়ে যাবে। হ্যালুসিনেশন দেখা দেবে। সেবনকারী অত্যন্ত হিংসাত্মক ও আক্রমণাত্মক আচরণ করে। একটি এলএসডি ব্লট সেবন করলে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত এর প্রতিক্রিয়া থাকে। অতিরিক্ত সেবনে ২০ ঘণ্টা পর্যন্তও প্রতিক্রিয়া হয়। হাফিজ আক্তার বলেন, এলএসডি বাংলাদেশে একেবারেই নতুন একটি মাদক। দাম বিবেচনা করলে এটি সাধারণত উচ্চবিত্তের মাদক, কারণ প্রতি ব্লট বিক্রি হতো ৩ থেকে ৫ হাজার টাকায়। বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পর্যায়ে ক্রেতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আমরা তদন্তসাপেক্ষে মাদকটির ক্রেতাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেব। যেহেতু এটি বিদেশ থেকে আসে সেখান থেকে সাপ্লাই বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

এলএসডি দামি একটি মাদক। ভারতের অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর এই মাদকটি আলোচনায় আসে। তার বিরুদ্ধে এই মাদক নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। ১৯৩৮ সালে সুইস রসায়নবিদ আলবার্ট হফম্যান প্যারাসাইটিক ফাঙ্গাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এলএসডি আবিষ্কার করেন। প্রথম দিকে এলএসডি ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হতো। তবে ওষুধটি মস্তিষ্কের ক্ষতি করে বলে এটিকে নিষিদ্ধ করা হয়।

গত ১৫ মে রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গেটের বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুর রহমান হঠাত্ দৌড়ে এসে ‘আমাকে মাফ করে দাও! আমাকে মাফ করে দাও’—বলতে বলতে এসে এক ভ্রাম্যমাণ ডাব বিক্রেতার কাছ থেকে দা নিয়ে নিজের গলায় সেটি চালিয়ে দেয়। ঐ অবস্থায় তিনি দৌড়ে মেডিক্যাল কলেজের বহির্বিভাগের সামনে চলে যান। উপস্থিত সবাই বীভত্স এই দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন। ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার পর থেকে হাফিজুরের খোঁজ পাচ্ছিল না তার পরিবার। নিখোঁজের আট দিন পর পুলিশের সহায়তায় গত ২৩ মে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে হাফিজুরের লাশ শনাক্ত করেন তার বড় ভাই হাবিবুর রহমান।