নাট্যকার, নির্মাতা ও অভিনেতা, তিন পরিচয়েই দর্শকদের কাছে দারুণ এক পরিশীলিত নাম নরেশ ভূঁইয়া। তিন দশক ধরে নাট্য জগতে তার অবস্থান ও কার্যক্রম সমৃদ্ধ করেছে এই শোবিজ অঙ্গনকে । সংসারও করছেন গুণী শিল্পীর সঙ্গেই। গত দু-বছর তাদের সন্তানও অভিনয়ে দারুণ স্বাক্ষর রেখেছেন। এই সময়ের কাজ ও ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন বিনোদন প্রতিদিনের সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এ এম রুবেল
বর্তমান কাজ প্রসঙ্গে জানতে চাই—
প্রচার চলতি ‘একশো তে একশো’, ‘বাকরখানি’ ধারাবাহিক নাটক ও ওয়েব সিরিজি ‘ম্যাচ উইনার’-এর কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় যাচ্ছে।
এখন অসংখ্য নাটক নির্মিত হলেও জনপ্রিয়তার পাল্লা ভারী না হওয়ার কারণ কী বলে মনে করেন?
জনপ্রিয়তা পাল্লা ভারী হচ্ছে না এটা বলা যাবে না। বরং বলা যায়, ভালো কাজ কয়টা হচ্ছে! এখন অনেক কাজেরই অনেক ভিউ দেখা যায়। জনপ্রিয় না হলে তো ভিউ হয় না।
তাহলে কী বলতে চাচ্ছেন ভিউ হলেই সেটা জনপ্রিয়!
না, বিষয়টি তেমনও না। খারাপ কিছু কাজের বা কন্টেন্টেরও ভিউ হয়। আসলে আমাদের কাজটি দেখে তার ভিউকে মূল্যায়ন করতে হবে। আর ভালো কাজের মাঝে এমন দু-একটি কাজ থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
একটি নাটক জনপ্রিয়তা পেলেই সেটাকে কপি করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আগেও আমরা এই চর্চা দেখেছি। একটি সিনেমা বা নাটক হিট হলে তার সিক্যুয়েল বা সেটার অনুকরণে একাধিক কাজ করা হয়েছে। আসলে সহজ পন্থা অবলম্বন করতে গিয়ে পরীক্ষিত একটি বিষয়কে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। বেশিরভাগ নির্মাতাই এই পথে হাঁটেন। এটাতে দোষের কিছু আমি দেখি না।
এখন ভিউ গুণে স্টার ও নাটকের মান নির্ধারণের চর্চা চলছে। বিষয়টি নিয়ে কী বলবেন?
এই চর্চাটা এখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কয়েক জনকেই আমরা পর্দায় দেখি এবং তাদেরই ভিউ হয়। প্রযোজক বা টিভি চ্যানেল যখন নাটক বানায় তখন তারা ঠিক করে দেয় যে, ওই অভিনেতা বা অভিনেত্রী দিয়ে অভিনয় করাতে হবে। যাদের ভিউ বেশি হয় তাদের নিয়েই নাটক বানাতে চায়।
তাহলে কী বলতে চাচ্ছেন নির্মাতার কোনো ভূমিকা এখানে নেই?
অবশ্যই নেই। কারণ যারা নির্মাণ করান তাদের নিজেদের পছন্দের শিল্পী ছাড়া তো একজন পরিচালক কাজ করতে পারবে না। প্রকৃতপক্ষে ভিউ মার্কা শিল্পী ছাড়া চাইলেও কেউ কাজ করতে পারবেন না। দু-একজন করছে না, তা না। কিন্তু সেটা গণনায় আনার মতো না।
নির্মাতা-শিল্পীরা নিজেস্ব ঘরানার বাইরে কাজ করতে চান না। এই চর্চা নতুন শিল্পী তৈরিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বলে মনে করেন না?
প্রতিবন্ধকতা কিছুটা তো তৈরি হচ্ছেই। তবে এটা নতুন কোনো চর্চা না। এখন বিভিন্ন মাধ্যমে নাটক প্রচার ও ভিউ শব্দটি আসার কারণে এটা চোখে পড়ছে। এখন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ওদের ছাড়া কাজ করলে সেই কাজ মানুষ দেখবে না। তাই বাধ্য হয়েই নির্মাতাকে সেই শিল্পী দিয়ে কাজ করাতে হয়। তবে প্রতিবছরই কিন্তু নতুন শিল্পী তৈরি হচ্ছে। এটা বলতে পারি, আগে হয় তো ৬০ ভাগ নাটকে নতুনদের সুযোগ দেওয়া হতো, এখন ৪০ ভাগ নাটকে দেওয়া হচ্ছে।
স্ক্রিপ্ট ছাড়া নাটক নির্মাণের প্রবণতা নাটকের মান কতটা বজায় রাখতে পারছে বলে মনে করেন?
অনেক নির্মাতাই এ ধরনের কাজ করে থাকেন। একেকজনের কাজের স্টাইল একেকরকম। এটা স্ক্রিপ্ট ছাড়া বলা যাবে না, একটা আউটলাইন নিয়ে গিয়ে সেখানে কাজ করে থাকেন। আমার মনে হয় দক্ষ পরিচালক হলে মান কমার কোনো কারণ নেই।
নাটকে চরিত্র সংকট দিনদিন প্রকট হচ্ছে। এটা একটি ভালো গল্প তুলে ধরার অন্তরায় বলে মনে করেন না?
ভিউ মার্কা শিল্পীদের কেন্দ্র করে গল্প তৈরি করলে তো গল্পের বৈচিত্র্যতা কমে যাবেই। তারপরও ভালো কাজ হচ্ছে, তবে সেটা অনেক কম। আগে চরিত্র গল্প তৈরি করে চরিত্র অনুযায়ী শিল্পী নির্বাচন করা হতো। কিন্তু এখন চরিত্র নির্বাচন করে গল্প তৈরি করা হয়।
উন্মুক্ত মাধ্যমে নাটক রিলিজ হওয়ায় মান দিনদিন কমছে। আপনি এ নিয়ে কী মন্তব্য করবেন?
আমি এটা মনে করি না। একজন নির্মাতা নিজের চিন্তাধারা থেকেই একটি নির্মাণ করে থাকে। ভালো কিছু সৃষ্টির নেশা সবারই থাকে।
নাটক-ওয়েব সিরিজের অশ্লীলতার ব্যবহার অবক্ষয় নাকি সময়ের চাহিদা বলবেন?
একটি কাজ নিজেস্ব সংস্কৃতির দৃষ্টিতে অশ্লীল মনে হতেই পারে। ওটিটির কাজ বিশ্বে অন্যান্য কাজের দিকে দৃষ্টি রেখে করা হয়। তাদের সঙ্গেও তো তাল মেলাতে হবে। আপনার ভালো না লাগলে দেখবেন না। আবার একটি কাজ একজনের কাছে ভালো লাগে, অন্য জনের কাছে খারাপ লাগে। এটা আসলে যার যার দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার।