কতটুকু বাস্তবায়িত হয় এডিপি?

আগামী বছরের বাজেট আসন্নপ্রায় এবং সবই যদি ঠিক থাকে, তাহলে করোনাকালের দ্বিতীয় বাজেট ৬ লাখ ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা, যা বর্তমান বছরের বাজেটের চেয়ে ১৪ শতাংশ বেশি এবং আগামী ৩ জুন তারিখে মহান জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী কর্তৃক এই বাজেট উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এই বাজেটের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘জীবন-জীবিকার বাজেট ও আগামীর বাংলাদেশ।’ এই প্রস্তাবিত বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো উন্নয়ন বাজেট, যাকে বলা হয়ে থাকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), যার পরিমাণ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বর্তমানে চলমান বিদায়ি বছরের এডিপি বাস্তবায়নের গতিপ্রকৃতির সর্বশেষ অবস্থা পর্যালোচনা করাই এই প্রবন্ধের মুখ্য উদ্দেশ্য।

এখানে উল্লেখ্য যে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে গতি তেমন লক্ষ করা যাচ্ছে না এবং করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণের কারণে চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই থেকে এপ্রিল) এডিপি বাস্তবায়নের হার অর্ধেকেরও কমে অবস্থান করছে। চলতি অর্থবছরের মাঝপথে এসে সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) প্রণয়ন করেও বাস্তবায়ন বাড়ানো যায়নি। যার ১০ মাসে বাস্তবায়নহার মাত্র ৪৯.০৯ শতাংশ (উত্স :পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের (আইএমইডি) ওয়েবসাইট)। করোনা মহামারির মধ্যেও বরাদ্দের মাত্র ২৫.৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ চিত্র অনেকটাই স্বাভাবিক। অর্থবছরের শেষ দিকে এসে বিল পরিশোধসহ অন্যান্য কাজে গতি আসে বেশি। এছাড়া গত ২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই সব ধরনের উন্নয়নকাজে স্থবিরতা ছিল এবং সরকারও কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধন করেছে। এর পরও সরকার উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দের ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত খরচের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু খরচ করতে পারছে না বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। তাই উন্নয়ন খাতে ব্যয় তুলনামূলক কম হয়েছে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে, যার প্রভাব পড়েছে বাজেট বাস্তবায়ন হারে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে চলতি অর্থবছরে এডিপিতে ২ লাখ ৯ হাজার ২৭২ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে খরচ হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৬৬ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা, বৈদেশিক সহায়তা থেকে পাওয়া ৩৩ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিলের ২ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে খরচ হয়েছিল এডিপির ৯৮ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা।

তবে এ বছর বাকি এক মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে এডিপির ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হতে পারে বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। করোনার ফলে গত অর্থবছর ও চলতি অর্থবছরে কাজ কিছুটা কম হয়েছে। তার পরও গত বছর সর্বাত্মক লকডাউনের পরা দ্বিগুণ লোকবল দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। অগ্রগতি যা-ই হোক না কেন, অর্থবছর শেষে এ হার বেড়ে ৮০ শতাংশের ওপরে চলে যাবে। কারণ সব প্রকল্পের কাজই চলমান রয়েছে।

কিন্তু অর্থনীতিবিদগণ বলছেন, প্রতি বছরই এডিপি বাস্তবায়নের হার প্রথম ছয়-সাত মাসে অনেক কম থাকে, যা শেষের দিকে ত্বরিত গতিতে বাড়ানো হয় যেখানে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন সব সময়ই রয়ে যায়। তাছাড়া প্রশাসনিক দক্ষতা, জবাবদিহিতার অভাবেও এডিপি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যে বিভাগটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা, সেটিই সবচেয়ে অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে অর্থাত্ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হিসেবে স্বাস্থ্য বিভাগ সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন করেছে, যা একটি উদ্বেগের বিষয়।

এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতির জন্য একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। যেসব প্রকল্প পরিচালক সময়মতো কাজ বাস্তবায়ন করছেন তাদের পুরস্কার এবং যারা করছেন না তাদের তিরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের গতি অনেক ধীর ছিল। কিন্তু গত অর্থবছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ফলে এপ্রিল থেকে বাস্তবায়নের হার বাড়তে শুরু করেছে এবং গত অর্থবছরের চেয়ে শতাংশের দিক হতে সামান্য কম অগ্রগতি হলেও অর্থ ব্যয় কিন্তু বেড়েছে। অর্থবছরের শেষদিকে বাস্তবায়নের হার বাড়বে, কেননা পূর্তকাজ বা পণ্য কেনার সঙ্গে সঙ্গেই বিল পরিশোধ করা হয় না। প্রচলিত নিয়মমতে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অর্থবছরের শেষ দিকে এসে বিল পরিশোধ করা হয়।

এখন আসা যাক বাস্তবায়নে এগিয়ে আছে যেসব মন্ত্রণালয়। এদের মধ্যে ক্রমানুসারে রয়েছে—প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (বাস্তবায়নের হার ৭৪.৪৯ শতাংশ), বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) ৭০.৪৭ শতাংশ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ৬৯.৮৮ শতাংশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় (৬৯.৬৬ শতাংশ), কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ (৬৯.০৯ শতাংশ), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ (৬৬.৬২ শতাংশ), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (৬৩.৬৬ শতাংশ) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (৬৩.১২ শতাংশ)। বাস্তবায়নে পিছিয়ে রয়েছে যেসব মন্ত্রণালয় তাদের মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (৫.৭১ শতাংশ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ১৫.৬৪ শতাংশ এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ (১৯.১৩ শতাংশ, আইন ও বিচার বিভাগ ২৩.৯৪ শতাংশ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ (২৫.৪৬ শতাংশ), মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ (২৬.৫৫ শতাংশ) এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় (২৯.১৫ শতাংশ) আরএডিপি বাস্তবায়ন করেছে এই অর্থবছরের ১০ মাসে।

এখন এডিপির বাস্তবায়ন বাড়াতে যা যা পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সরকার এ ব্যাপারে সচেষ্ট রয়েছে এবং করোনাকালে স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি এবং বাস্তবায়নের হারও তুলনামূলক বিচারে কম বিধায় এ জায়গাটিতে সবার দৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন কর্মসূচি আরো জোরদার করা হবে। ভ্যাকসিন কিনতে যেন অর্থের কোনো সংকট না হয়, সেজন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে আসছে বাজেটে। একই সঙ্গে শিল্প খাতকে চাঙ্গা রাখতে চালু থাকা প্রণোদনা কর্মসূচিগুলো চালু রাখা হবে। করোনায় দেশের সব ধরনের উত্পাদন কমেছে, আয় কমেছে সরকারের এবং বেশির ভাগ মানুষেরও। অথচ বেড়েছে ব্যয়। যার ফলে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য মোট অভ্যন্তরীণ উত্পাদন (জিডিপি) টার্গেট কমিয়ে আনছে সরকার। চলতি বছরের বাজেটে জিডিপির টার্গেট ধরা হয়েছে ৮.২ শতাংশ। আসছে বাজেটে সেটাকে কমিয়ে ধরা হচ্ছে ৭.২ শতাংশ এবং আগামীর বাজেট হবে জীবন-জীবিকা সুরক্ষার বাজেট, যার জন্য বাজেটে সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে কৃষি, খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা খাত। বাজেট বাড়ালেই হবে না, তার শতভাগ বাস্তবায়ন দেখতে চায় জাতি। তাই প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়গুলোকে আরো শক্তিশালী তদারকির পথ বেছে নিতে হবে। করোনাকালে সেটাই হবে সরকারের বড় অঙ্গীকার।

n লেখক :গবেষক ও সিন্ডিকেট সদস্য,

সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা