সাধন সরকার
সম্প্রতি ‘সারফেস আরবান হিট আইল্যান্ড ইনটেনসিটি ইন ফাইভ মেজর সিটিজ অব বাংলাদেশ : প্যাটার্নস ড্রাইভার অ্যান্ড ট্রেন্ডস’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে রাজধানী ঢাকা শহরসহ বড় শহরগুলোর তাপমাত্রা বৃদ্ধির তথ্য উঠে এসেছে।
শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এক একটি উষ্ণ নগরদ্বীপ তৈরি হচ্ছে! বঙ্গোপসাগরের উপকূলে গড়ে ওঠা পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপের এই জনপদের মানুষেরা আজীবন নাতিশীতোষ্ণ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। খুব বেশি গরম ও খুব বেশি ঠান্ডা এখানে অসহনীয়। রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহর উষ্ণ নগরদ্বীপ একদিনে তৈরি হয়নি। অপরিকল্পিতভাবে ভবন তৈরির মহোত্সব হয়েছে এবং হচ্ছে। অনিয়ম করে, প্রভাব খাটিয়ে যেনতেনভাবে যেখানে সেখানে ভবন তৈরি করা হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন উষ্ণ নগরদ্বীপ তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। নগরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য একটি-দুটি নয় সামগ্রিকভাবে অনেকগুলো কারণ দায়ী। নগরের ভেতরে ও এর আশপাশের খাল-বিল, নালা, জলাভূমি ভরাট করে একেক পর এক ভবন তৈরি করা হয়েছে। বনভূমি উজাড় করা হয়েছে, গাছপালা কাটা হয়েছে। নগরে অতিমাত্রায় এসির ব্যবহার, আশপাশের ইটভাটা, ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়া, বর্জ্য থেকে তৈরি মিথেন গ্যাস তাপমাত্রা ধরে রেখে শহরের তাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া গ্রীষ্মকালে অতি গরম পড়ার অন্যতম একটি কারণ হলো, দিনের তুলনায় রাত ছোট হওয়ার কারণে রাতে তাপ বিকিরণ করে ভূপৃষ্ঠ পুরোপুরি ঠান্ডা না হওয়া। ঢাকা শহরকে কংক্রিটে মুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। নগরে ভবন তৈরিতে পোড়া ইট এবং সিমেন্ট-বালুর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার করার কারণে এসব বস্তু তাপমাত্রা ধরে রাখছে। তাই ভবন নির্মাণে পোড়া ইটের বদলে পরিবেশবান্ধব ‘না পোড়ানো ইটের’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।
ভেতরে খাল আর চারপাশে নদ-নদীর শহর ঢাকা। এমন শহর পৃথিবীতে খুব কমই আছে। এমন শহরের সুবিধা কাজে লাগিয়ে জল-সবুজে ঢাকা শহর গড়ে তোলা কঠিন কিছু নয়। ঢাকাকে আধুনিক, আরামদায়ক ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলার বহু পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সেসব পরিকল্পনা বেশিরভাগ সময় আলোর মুখ দেখে না। ‘বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা’ বা ড্যাপের বাস্তবায়ন নিয়েও বারবার প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং হচ্ছে। কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, আবাসন কারবারি, স্বার্থবাজ মহলের কারণে ঢাকার আজ এই অবস্থা। শহরে সব ধরনের দূষণ বন্ধ করতে হবে। রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহর বাসযোগ্য করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। নদ-নদী, খাল-বিল, বনভূমি, পার্ক-উদ্যানসহ পরিবেশের সব উপাদান সংরক্ষণ করতে হবে। পরিবেশের সব উপাদান সংরক্ষণ হলে তাপমাত্রা সহনীয় থাকবে। দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে টেকসই, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জল-সবুজে শহর গড়া অসম্ভব নয়।
ঢাকা