বর্ষা মৌসুমে মহানগরীতে জলজট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেন উন্নয়ন করছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। কিন্তু বাস্তবায়নের পর সড়ক থেকে ড্রেন উঁচু হচ্ছে দেড় ফুট। এতে বিপাকে পড়েছে অট্টালিকা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকসহ জনসাধারণ। তাই তারা যাতায়াতে নিজেদের সুবিধার্থে ফুটপাত ও সড়কের বেশ কিছু জায়গা দখল করে নির্মাণ করছে র্যাম্প (গাড়ি ওঠানামার ঢালু পথ)। এতে সংকোচিত হয়ে পড়ছে বেশির ভাগ সড়ক।
অন্যদিকে নির্মাণাধীন এসব ড্রেন উঁচু হওয়ায় নিচু হয়ে যাচ্ছে বেশির ভাগ বাড়িঘর, দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ফলে বর্ষা মৌসুমে বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করে নোংরা পরিবেশ তৈরি হবে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেন খুলনা মহানগরীর বাসিন্দারা।
কেসিসি সূত্র জানায়, খুলনা সিটি করপোরেশনের মোট আয়তন ৪৫ দশমিক ৬৫ বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে ৩১টি ওয়ার্ড রয়েছে। ওয়ার্ডগুলোতে রয়েছে ১ হাজার ২০৫ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার ড্রেন। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে এসব ড্রেনের বেশির ভাগ বেহাল হয়ে পড়ায় সামান্য বৃষ্টিতে জলজট ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ফলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরীর বাসিন্দাদের। এ অবস্থায় জনসাধারণের ভোগান্তি লাঘবে জলাবদ্ধতা নিরসন ও ড্রেনেজব্যবস্থা উন্নয়নে ৮৪৩ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ঐ প্রকল্পের আওতায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৭টি ড্রেনের উন্নয়নকাজ চলছে। ড্রেনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ট্যাংক রোড ড্রেন, আহসান আহম্মদ রোড ড্রেন, হাজি মুহসিন রোড ড্রেন, গগণবাবু রোড ড্রেন, রতন সেন সরণির দুই পাশের ড্রেন, ভৈরব স্ট্যান্ড রোড ড্রেন, পিসি রায় রোডের ড্রেন, ক্লে রোডের ড্রেন, সিমেট্রি রোডের ড্রেন, শামসুর রহমান রোডের ড্রেন ইত্যাদি।
কেডিএ অ্যাভিনিউ ও শামসুর রহমান রোডে গিয়ে দেখা যায়, ড্রেনগুলো সড়ক থেকে দেড় ফুট, কোথাও দেড় ফুটের বেশি উঁচু করা হয়েছে। এতে পথচারীরা সড়ক থেকে ফুটপাতে, ব্যবসায়ীরা দোকান বা শোরুমে এবং মালিক-ভাড়াটিয়ারা বাসাবাড়িতে উঠতে পারছেন না। ফলে ফুটপাত ও সড়কের বেশ কিছু জায়গা দখল করে যে যার মতো নির্মাণ করছেন র্যাম্প (গাড়ি ওঠানামার ঢালু পথ)। বাড়ির সামনে অবৈধভাবে র্যাম্প নির্মাণ করায় সড়কগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এতে পানি নিষ্কাশনের ড্রেনও সিমেন্টের নিচে ঢাকা পড়েছে।
এ ব্যাপারে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী এজাজ মোর্শেদ চৌধুরী কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘ভালো কাজ আপনাদের চোখে পড়ে না, শুধু খারাপ কাজ খুঁজে বেড়ান।’ সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের খুলনা জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকট কুদরত-ই-খুদা বলেন, অপরিকল্পিতভাবে উন্নয়নকাজ করলে প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভেস্তে যায়। জনগণের ভোগান্তি বাড়ে। সর্বোপরি অর্থের অপচয় হয়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে সবাইকে সতর্ক হতে হবে।
ড্রেনেজ প্রকল্পের ডিজাইন করেছেন ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালটেন্ট লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী খোরশেদুর আলম বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী জোয়ারের সময় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে রূপসা নদীর পানির উচ্চতা হয় ২ দশমিক ৮৩ মিটার। সেখানে শহরের সড়কগুলোর উচ্চতা বিভিন্ন স্থানে ১ দশমিক ২ মিটার, ২ মিটারের নিচে, ২ মিটার, ২ দশমিক ৫ মিটার । ফলে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেলে প্লাবিত হবে। এছাড়া পানির লেভেলও ঠিক রাখতে ড্রেন উঁচু করা হচ্ছে। তাছাড়া সিটি করপোরেশনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত হচ্ছে সড়ক দেড় ফুট উঁচু করবে। সেক্ষেত্রে ড্রেন সড়ক থেকে দেড় ফুট উঁচু করা ছাড়া উপায় নেই।
এ প্রকল্পে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)। এ প্রতিষ্ঠানের প্রফেসর ড. মো. শাহজাহান বলেন, সিটি করপোরেশন সড়কের ডিজাইন করেছে। ডিজাইনে তারা কার্পেটিংয়ের ওপর কার্পেটিং রাখছে। তারা পুরোনো কার্পেটিং ওঠাবে না। এতে সড়ক দেড় ফুট উঁচু হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ড্রেন সাধারণ সড়ক থেকে এক ফুট উঁচু করার নিয়ম রয়েছে। সে কারণে ড্রেন বেশি উঁচু হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া জলবায়ুর পরিবর্তনে পানির উচ্চতা বাড়ছে এবং খুলনা অঞ্চল বসে যাচ্ছে। সে কারণে ৫০ বছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী ড্রেন উঁচু করে নির্মাণ করা হচ্ছে।