দাদা-দাদুর সংসার থেকে ভিন্ন সংসার পেতেছিলেন আমার মা-বাবা। ফলে আমাদের বাড়ি বলতে ছিল একটা ঘর। বাড়ির দক্ষিণ দিকে কিছু বিচি কলাগাছ লাগানো হয়েছিল ঝড়ের ঝাপটা থেকে বাঁচার জন্য। ছিল একটা আকাশ ছোঁয়া নারিকেলগাছ। দাদির বাড়ি ছিল ১০০ গজ দূরত্বে, যেখানে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, জামরুল, বাতাবি লেবু, শরিফা, আমড়া, নারকেল গাছের ছড়াছড়ি। আমি কেবল দেখতাম সবার গাছে থোকায় থোকায় ঝুলে আছে পেলব সবুজ আম। কোনটি লম্বাটে, কোনটি গোলাকৃতি, কোনটি ছোট, কোনটি বেশ বড় বড়।
প্রতিবেশী শিশুদের মতো অন্যের বাগানের আম কুড়ানোর স্বাধীনতাও আমার ছিল না, মা বকবেন। আমাকে লোভ সংবরণ করতে হয়েছে। চেয়ে থাকতে হয়েছে। অন্যের গাছে ঝুলে থাকা সেই আম দেখতে দেখতে হলুদাভ হতো, হলুদ হতো। প্রতিবেশীদের একটি আমগাছ ছিল, ওটার নাম ছিল ‘সিঁদুরে আম’, বোঁটার চারপাশে গোলাপি আভার ওপর ছিটছিটে লাল রঙের আমগুলোর দিকে আমি যে কত চেয়ে থেকেছি, খাওয়ার লোভে নয়; কারণ আমি জেনে গিয়েছিলাম ওগুলো আমি কখনো হাতের নাগালে পাব না, আমি বুঝে গিয়েছিলাম এই পৃথিবীর অনেক কিছুই আমি কেবল দূর থেকে দেখতে পাব, আমার দেখার অধিকার আছে, আমার হাত বাড়াবার অধিকার নেই।
হরেক রকম নাম ছিল সেই সব লোভনীয় আমের। দাদির ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ছিল শাখাবহুল উঁচু এক আমের গাছ। বেশ বড় আকৃতির আম ধরত সে গাছটায়, নাম ছিল রসুইন্যা আমগাছ, পাকা আম থেকে রসুনের গন্ধ আসত, পোকা ধরত না, সুমিষ্ট আম। আমাদের ঘরের দক্ষিণে প্রতিবেশীর এক টুকরো জমি ছিল, হালকা ঝোপঝাড়ে ঢাকা। ঝোপের মধ্যে ছিল এক বয়োবৃদ্ধ আমগাছ, সেটার নাম ছিল আহাইড়া আমের গাছ। অনেকটা ফজলি আমের গড়নের আম ধরত সেই গাছটায়। বাড়ির পুবধারের প্রতিবেশীর বাড়িতে অনেক আমের গাছ ছিল, তবে তাদের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। অথচ তাদের বাড়ির আমে আমাদের হক ছিল, ও বাড়ির কাঁচা-পাকা আমের ভাগ পেতাম। আমার মায়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো ছিল। শিশুরা বাতাস বইতে দেখলেই তাদের বাড়ির গাছের তলায় জড়ো হতো আম কুড়ানোর আশায়। মাঝেমধ্যে আমিও মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে আম কুড়াতে যেতাম।
এখনো আমি সেইসব দিনের মধ্যে বেঁচে আছি। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বেড়া দেওয়া খেতের পাশ দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছি, কখনো খালা বাড়ি থেকে, কখনো সফিপুর থেকে মায়ের দেওয়া ফর্দ অনুযায়ী বাজার নিয়ে। কখনো হাটে যেতাম শুধু নানুর জন্য পান, সাদা পাতা, খর কিনে আনার জন্য। আমার সেই বাড়ি, বাড়ির পথ, প্রতিবেশী, আত্মার আপনজন, সেই কাঁচা-পাকা আম, সরিষায় খেত, এক মালাই নৌকার তলদেশে জয়ন্তী নদীর ছোট ছোট ঢেউয়ের গান, খেতময় ফুটে থাকা বেগুনি ফুলের ওপর শিশির, আমার বয়ঃসন্ধিক্ষণ সব আমাকে ছেড়ে গেছে। শুধু ছেড়েই যায়নি, হারিয়ে গেছে, সেখানে ফেরার সব পথ ফুরিয়েছে জয়ন্তী নদীতে। সেখানে হয়তো এখন নতুন চর জেগে উঠেছে, নতুন ফসল বুনছে অন্য কেউ।
সুপ্তি জামান