পরনে তাহাদের টি-শার্ট, জিনস, চোখে সানগ্লাস, চুলে নিত্য নূতন স্টাইল। পাড়া, মহল্লা, অলিগলি ও ফুটপাতে জমাইয়া আড্ডা দেয় তাহারা, উচ্চৈঃস্বরে হিন্দি-ইংরাজি গান গাহিয়া মেয়েদের উত্ত্যক্ত করিয়া বেড়ায়। শুধু তাহাই নহে, মাদক সেবন, চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ এমনকি হত্যাকাণ্ডের ন্যায় জঘন্য অপরাধের সহিতও তাহারা জড়িত। ইহাকে বলা হইয়া থাকে ‘কিশোর গ্যাং কালচার’। দিন যতই যাইতেছে কিশোরদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধগুলি ক্রমেই হিংস্র, নৃশংস ও বিভীষিকাপূর্ণরূপে দেখা দিতেছে। দেশ জুড়িয়া নগরকেন্দ্রিক কিশোর গ্যাং কালচার ভয়ংকর রূপ ধারণ করিয়াছে। কেবল শহর কিংবা নগরেই নহে, জিলা-উপজিলা-গ্রামেও ছড়াইয়া পড়িতেছে ভয়াবহ কিশোর গ্যাং কালচার।
সাধারণত কিশোর বয়সিদের দ্বারা সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে কিশোর অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশে ১৮ বত্সরের নিম্নে কেহ অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকিলে তাহাদের কিশোর অপরাধী হিসাবে বিবেচিত করা হইয়া থাকে। কিশোর কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েরা সাধারণত আবেগপ্রবণ হয়। তাহাদের মধ্যে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এই বয়সে কিশোর-কিশোরীরা ভালো-মন্দের বিচার বিবেচনা করিতে পারে না, নিজেদের সিদ্ধান্তগুলিকেই তাহারা সঠিক ভাবিয়া লয়। কোনো কারণে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণকেন্দ্রিক আশা ভঙ্গের ঘটনা ঘটিলে তাহারা হতাশাগ্রস্ত হইয়া বিভিন্ন অপরাধের সহিত জড়াইয়া পড়ে। ইহার পাশাপাশি সমাজব্যবস্থা, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাহচার্য, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রের নানাবিধ উপকরণ কিশোর অপরাধী তৈরির উপাদান হিসাবে কাজ করিয়া থাকে। সমাজে বিদ্যমান অসংগতি, দারিদ্র্য, ধনী-গরিব বৈষম্য, হতাশা, পারিবারিক অস্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতির অভাব ইত্যাদি কারণে কিশোররা অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হইয়া পড়ে। বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাংয়ের লালন-পালন ও প্রশ্রয় দিয়া থাকে রাজনৈতিক বড় ভাই ও গডফাদারেরা। পুলিশ ও র্যাব সূত্রে জানা গিয়াছে কেবল ঢাকা শহরেই রহিয়াছে ৫০টি কিশোর গ্যাং আর ইহাদের পিছনে ৫০ জন গডফাদার, ঢাকার বাহিরে সেই সংখ্যা শতাধিক ছাড়াইয়া যায়। এই সকল তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাই এবং গডফাদারেরা নিজেদের স্বার্থে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর অপরাধীদের শেল্টার দিয়া থাকে। কিশোর বয়স থেকে গ্যাং কালচারে জড়িত থাকিয়া তাহারা একপর্যায়ে নিজেরাই মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী হইয়া পড়ে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়। কিশোরদের যেই বয়সে বইখাতা, স্কুলব্যাগ লইয়া ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সে নানাবিধ অপরাধ সংঘটিত করিয়া তাহারা ভবিষ্যত্ সম্ভাবনাকে নষ্ট করিয়া দেয়।
বাংলাদেশের আইনে ১৮ বত্সর বয়স পর্যন্ত কেহ অপরাধ সংঘটিত করিলে দণ্ডবিধিতে কোনো বিচারকার্য সম্পাদন করা যায় না, তাহাদের আটক করিয়া সংশোধন কেন্দ্রে পাঠাইতে হয়। আমাদের দেশে পর্যাপ্ত কিশোর সংশোধন কেন্দ্রের অভাব রহিয়াছে, গাজীপুরে দুইটি এবং যশোরে একটি শিশু কিশোর সংশোধন কেন্দ্রের সকল মিলাইয়া ধারণক্ষমতা ৬০০ জন। ইহার ফলে আটক কিশোর অপরাধীদের একটি বড় অংশকে উন্নয়ন কেন্দ্রে স্থান সংকুলানের অভাবে কারাগারেই রাখিতে হয়। জামিনে মুক্ত হইয়া তাহারা আবার অপরাধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়। বস্তুত, পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের কঠোর উদ্যোগের মাধ্যমেই কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টানিয়া ধরিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে পরিবারকে আগাইয়া আসিতে হইবে প্রথম। শিশু-কিশোরদের আবেগকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করিয়া তাহাদের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক বিষয়গুলি যত্ন সহকারে বুঝাইতে হইবে। তাহাদের মানসিক বিকাশ ও সুষ্ঠু সামাজিকীকরণের জন্য গঠনমূলক পারিবারিক এবং সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করিতে হইবে। দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে সংশোধন কেন্দ্র গড়িয়া তুলিবার পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলিকে সমাজের পিছাইয়া পড়া দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের শিক্ষাদান কর্যক্রমে আগাইয়া আসিতে হইবে। সকলের সমন্বিত ইতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমে কিশোর গ্যাং কালচার নির্মূল করিয়া শিশু-কিশোরদের সুনাগরিক এবং ভবিষ্যত্ সম্পদ হিসাবে গড়িয়া তোলা প্রয়োজন।