মেধার সঠিক মূল্যায়নে গড়ে উঠবে দেশ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার লেখা ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইটির ২০ পৃষ্ঠায় ঘটনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘পাসপোর্ট অফিসার শুকুর সাহেব খুব ভালো লোক। ব্যবহারও চমত্কার, আর কাজও করতে পারেন। তার মতো কর্মচারী হলে দেশের উন্নতি হতে বাধ্য।’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ছিলেন প্রজ্ঞাবান, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। তার দূরদর্শী চিন্তা ও চেতনা দ্বারা তিনি দেশের উন্নয়নের মূল উপাদান অনেক আগেই চিহ্নিত করেছিলেন।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে ভোগবাদী অর্থনীতির প্রলোভনে আমাদের নৈতিকতা ও আদর্শের যথেষ্ট অবক্ষয় হয়েছে। দেশের সার্বিক মঙ্গল চিন্তা না করে শুধু নিজের অর্থনৈতিক লাভের বিষয়টিকে অনেকেই আমরা প্রাধান্য দিয়ে থাকি। ফলে জনসম্মুখে বেরিয়ে আসে দুর্নীতির খবরে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় সরকারকে। নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি জাতির জন্য মোটেও মঙ্গলজনক নয়। কারণ, সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জাতির ভাগ্য নির্ধারণে কাজ করে। দেশের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বাস্তবায়নে এদের ভূমিকা অপরিসীম। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ জনবলই সরকারি সেবার মান উন্নয়নের প্রধান নিয়ামক। সরকারি সিদ্ধান্ত যত সঠিক ও সময়োপযোগী হয়, দেশ তত এগিয়ে যায়। এর জন্য দরকার মেধাবী ও যোগ্য লোকের হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও সুযোগ অর্পণ। অন্যথায় দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দুর্নীতির কারণে আর্থিক সম্পর্ক যদি মেধার চেয়ে বেশি মূল্যায়ন পায়, তাহলে তুলনামূলক কম যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এতে প্রতিষ্ঠান বা দেশ দুর্বল জনশক্তি পায়। এই দুর্বল জনশক্তি কোনো দৈব-দুর্বিপাকে দেশ বা প্রতিষ্ঠানের হাল ধরতে পারে না। কারণ চ্যালেঞ্জ নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত না বলেই তারা ভিন্ন পথে চাকরি বাগিয়ে নিতে চেষ্টা করেন। মানসিক শক্তিসম্পন্ন বুদ্ধিমান মানুষ কীভাবে তৈরি হয়, এ সম্পর্কে চমত্কার বিশ্লেষণ পাওয়া যায় দুবাইয়ের প্রতিষ্ঠাতা শেখ রাশিদ আল মাখতুমের এক সাক্ষাত্কারে। বিবিসির এক সাক্ষাত্কারে দুবাইয়ের ভবিষ্যত্ কী? এ প্রশ্নের জবাবে এই ধনকুবের শেখ বলেন, ‘আমার বাবা উট চালাতেন, আমি মার্সিডিজ চালাই, আমার ছেলে ল্যান্ড রোভার চালায়, আমার নাতি হয়তো বুগাতি ব্যারন চালাবে। কিন্তু আমার পুতি আবারও উট চালাবে।’ উপস্থাপক অবাক হয়ে তাকে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, কিন্তু এমনটা হবে কেন? তিনি উত্তরে বলেন, ‘দুঃসময় শক্তিশালী মানুষ তৈরি করে, আর শক্তিশালী মানুষ সুসময় তৈরি করে। সুসময় দুর্বল মানুষের জন্ম দেয় আর দুর্বল মানুষ দুঃসময় তৈরি করে।’ অসত্ ও সুযোগসন্ধানী মানুষ কখনো দেশপ্রেমিক হয় না, তাদের চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মানসিক শক্তি কম থাকে এবং মেধা ও যোগ্যতার মাপকাঠিতেও তারা পিছিয়ে থাকে। তাই অর্থের বিনিময়ে অবৈধ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে।

নিয়োগক্ষেত্রে দুর্নীতি নিরসনে সরকারের সদিচ্ছার কোনো অভাব নেই। এটা আমি হলফ করে বলতে পারি। পাবলিক সার্ভিস কমিশনে মৌখিক পরীক্ষা নিতে যখন বিশেষজ্ঞ পরীক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ পাই, তখন আমাদের সবাইকে একটি বিশ্রামকক্ষে অবস্থান করতে হয়। পরীক্ষার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে আমরা জানতে পারি যে কত নম্বর ভাইভা বোর্ডে আমি বহিঃপরীক্ষক হিসেবে নিয়োজিত থাকব। ভাইভা বোর্ডের চেয়ারম্যানও একই উপায়ে পরীক্ষার পাঁচ মিনিট আগে জানেন, কোন বোর্ডে তিনি সভাপতি। ফলে মৌখিক পরীক্ষায় আগে থেকেই পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অশুভ সিন্ডিকেটের অসদুপায় অবলম্বনের কোনো সুযোগ থাকে না। একটি দৈনিকের খবরের শিরোনাম ‘জেলা পরিষদ নয়, পার্বত্য জেলায় জনবল নিয়োগ করবে মন্ত্রণালয়’। অনিয়ম দূর করতে জেলা পরিষদের পরিবর্তে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে তিন পার্বত্য জেলায় জনবল নিয়োগের বিষয়টি নিবিড় তত্ত্বাবধান করার নির্দেশ দিয়েছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।

এত সতর্কতার পরেও ১২ এপ্রিল ২০২১ইং-এ একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার খবরের শিরোনাম ‘এখন এক কোটি দেব, পরে আরও পাবেন’। এরকম খবর দেশের উন্নয়নের জন্য হতাশাব্যঞ্জক। খবরে প্রকাশ স্বাস্থ্য খাতে ১ হাজার ৮০০ জনকে নিয়োগের প্রক্রিয়ায় সচিবকে চিঠি দিয়ে জনপ্রতি ১৫-২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন নিয়োগ কমিটির দুই সদস্য। লিখিত পরীক্ষায় অস্বাভাবিক ভালো নম্বর, কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় কিছুই পারেননি তারা। মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থী পদের অর্ধেকেরও কম। করোনাকালে সরকারি হাসপাতালের কারিগরি জনবলের সংকট নিরসনে এই জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। লিখিত পরীক্ষায় ২ হাজার ৫২১ জন উত্তীর্ণ হয়, যা মোট পরীক্ষার্থীর ৫ শতাংশের মতো। তবে যারা উত্তীর্ণ হয়েছেন তাদের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ খুব ভালো নম্বর পান, যা থেকে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয় খুব কড়াকড়িভাবে। নিয়োগ কমিটির সদস্যরা বলছেন লিখিত পরীক্ষায় যেসব প্রার্থী ৮০ নম্বরের মধ্যে ৬০-৭৯ পেয়েছেন, তারা মৌখিক পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি বরং ভালো করেন লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া প্রার্থীরা। লিখিত অভিযোগে নিয়োগ কমিটির এক সদস্য লেখেন, আমাকে ১ কোটি টাকা আগেই দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রতিদানে তারা আমাকে যে তালিকা দেবে তাদেরকে মৌখিক পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দিতে হবে। কারণ, তারা লিখিত পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েছে। নিয়োগ কমিটির আরেক সদস্যের অভিযোগ—লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অত্যন্ত কঠিন ছিল। তা সত্ত্বেও উত্তীর্ণদের বেশির ভাগ অনেক ভালো নম্বর পান। সন্দেহ হওয়ায় কিছু খাতা খুলে দেখা যায় মুক্তার মতো হরফে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত লেখা, সেখানে কলম ধরার কোনো সুযোগ নেই। লিখিত পরীক্ষায় অনিয়মের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে মৌখিক পরীক্ষায় একটি বিশেষ কৌশল নেয় নিয়োগ কমিটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষায়ও লিখিত পরীক্ষার ছোট তিনটি প্রশ্নের উত্তর লিখে দিতে বলা হয়। এতে আগে উচ্চ নম্বর পাওয়া পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ভুল করে।

অসদুপায়ে চাকরি পাওয়া টেকনোলজিস্ট কি স্বাস্থ্য খাতে জাতির জন্য সুসময় বয়ে আনবে? এদের দিয়ে জনবলের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব, কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের গুণগত উন্নয়ন কী আদৌ ঘটবে? সরকারকে এ ধরনের অভিনব দুর্নীতির বিষয়ে আরো সচেতন ও সতর্ক হতে হবে। তবেই গড়ে উঠবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা।

n লেখক :উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও

প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়