দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে দেশের সীমান্তবর্তী আট জেলাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কমিটি। এই কমিটির মতে, ঐসব জেলার মধ্যে এবং ঢাকামুখী যাতায়াত বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। ঐসব জেলার গড় সংক্রমণের হার ক্ষেত্রবিশেষ কমবেশি ১০ শতাংশের ওপরে। জেলাগুলো হচ্ছে : চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, সাতক্ষীরা, যশোর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া ও খুলনা। এর মধ্যে শুধুমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত ২৪ মে থেকে লকডাউন চলছে। বাকি সাত জেলায়ও কঠোর লকডাউন করার পরামর্শ দিয়েছে বিশেষজ্ঞ কমিটি। তারা আরো বলছেন, যেসব কারণে করোনার সংক্রমণ বিস্তৃতি লাভ করে সেসব ক্ষেত্রই দেশে উন্মুক্ত। তবে কমিটি এরূপ সুপারিশ করলেও সরকার সারা দেশে চলমান বিধিনিষেধ আগামী ৬ জুন পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৪৪ জন; যা শনিবার ছিল ১ হাজার ৪৩ জন। গতকাল শনাক্তের হার ৭ দশমিক ৯১ শতাংশ থাকলেও ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তা বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ।
জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির পরামর্শেই বিধিনিষেধের মেয়াদ আগামী ৬ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘সংক্রমণ ৫ শতাংশে না পৌঁছানো পর্যন্ত এটি অব্যাহত থাকবে। তবে সেটিও পর্যবেক্ষণ নির্ভর থাকবে। গতকাল রবিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। ফরহাদ হোসেন জানিয়েছেন, আরো সাত সীমান্তবর্তী জেলায় লকডাউনের পরামর্শ এসেছে কমিটি থেকে, সেটি বিবেচনা করা হবে। অবশ্যই জীবন-জীবিকার ক্ষতি না করে পরামর্শক কমিটির এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশেষজ্ঞ কমিটির একজন সদস্য জানান, ‘সীমান্তবর্তী ঐসব জেলায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ তীব্রভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এ কারণে শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় কতিপয় সুপারিশ করা হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘লকডাউনের সময় বাস চলাচল যেন বন্ধ থাকে, এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যেন বাস না চলে, সে বিষয়ে জোর দিতে সুপারিশ করা হয়েছে।’
উল্লেখ্য, করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ২৪ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জে লকডাউন ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন, যা এখনো চলছে। বিশ্ব জুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো করোনা ভাইরাসের ভারতে উদ্ভূত ধরনটি বাংলাদেশেও মিলেছে। করোনা ভাইরাসের এ ধরনটির আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছে বি.১.৬১৭। মিউটেশনের কারণে এর তিনটি ‘সাব টাইপ’ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া গেছে বি.১.৬১৭.২ ধরনটি। ভারতে প্রথম এ মিউট্যান্ট শনাক্ত হয়েছিল বলে একে ভারতীয় ধরন বলা হচ্ছে। ইতিমধ্যে অন্তত ৪৪টি দেশে করোনা ভাইরাসের এই ধরনটি ছড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে চিহ্নিত করেছে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন’ (ভিওসি) হিসেবে। ভারত থেকে আসা তিন বাংলাদেশির দেহে করোনা ভাইরাসের এই ভ্যারিয়েন্ট শনাক্তের কথা গত ৮ মে প্রথম জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ পর্যন্ত ২৩ জনের শরীরে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাত জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের ভারতে উদ্ভূত ধরনটি পাওয়া গেছে, যারা কখনো প্রতিবেশী ঐ দেশটিতে যাননি। তিনি জানান, এর মানে হলো, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের অতি সংক্রামক এই ধরনটির কমিউনিটি সংক্রমণ শুরু হয়েছে। প্রসঙ্গত, শনিবার পর্যন্ত দেশে ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৩৮৬ জনের দেহে করোনার সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এ পর্যন্ত মারা গেছেন ১২ হাজার ৫৪৯ জন।