পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট

কাজ কী, করেন কী?

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। নিয়ম না মেনে একের পর এক নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছিলেন তৎকালীন এক উপাচার্য। এসব নিয়োগ সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদন হয়ে যায় দ্রুতই। তৎকালীন উপাচার্যের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব সিন্ডিকেট সদস্য ছিলেন। এসব অনিয়মের বিষয় তিনি কোনো আপত্তি তোলেননি। উলটো উপাচার্যের পক্ষে অবস্থানও নিয়েছিলেন। শেষে দেখা গেল ওই অতিরিক্ত সচিবের সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়টির একটি লোভনীয় পদে চাকরি পেয়েছেন।

সিন্ডিকেট সদস্যদের সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। সুবিধা নেওয়ার জন্য কেউ কেউ সিন্ডিকেট সদস্য হওয়ার জন্য বিভিন্ন দপ্তরে তদ্বিরও করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুসারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ পরিষদ হলো সিন্ডিকেট। সভাপতি হন উপাচার্য। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের আকার বড়, কয়েকটির ছোট। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী সংস্থা হিসাবে সিন্ডিকেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্রিয়াকলাপ, আর্থিক বিষয়াদি, সাধারণ ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করে।

সিন্ডিকেট সদস্য কত জন হবেন সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনেই তা উল্লেখ থাকে। আইন অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিন্ডিকেট সদস্যদের নিয়োগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে এ সংখ্যা ৯ থেকে ১৯ জন। এর কমবেশিও হয়। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে সদস্য ১৯ জন। আবার টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংখ্যা ১১ জন। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সংসদ সদস্যও সিন্ডিকেট সদস্য হন। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবরা সদস্য হন। সংশ্লিষ্ট সেক্টরের চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক, বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি, বিভাগীয় শহরে হলে বিভাগীয় কমিশনরাও সিন্ডিকেট সদস্য হন। সিন্ডিকেটে বড় সংখ্যক সদস্য থাকেন শিক্ষকদের মধ্যে থেকে।

যে সব দায়িত্ব রয়েছে সিন্ডিকেটের
সিন্ডিকেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী সংস্থা। আইন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিচালনার দায়িত্বে থাকে এবং বিশ্ববিদ্যালয় আইন, সংবিধি, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ও প্রবিধানের বিধান যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সিন্ডিকেটের দায়িত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে সিন্ডিকেটের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার স্বার্থেই সব ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে সিন্ডিকেটের ২৩ ধরনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও কার্যধারা সম্পর্কে নীতিমালা প্রণয়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে সিন্ডিকেটের। বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন, বার্ষিক হিসাব ও বার্ষিক সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রস্তাব বিবেচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বার্ষিক বাজেট আলোচনা এবং অনুমোদন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক প্রয়োজন নিরূপণ, সম্পত্তি অর্জন ও তহবিল সংগ্রহ এবং তা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগও তাদের দায়িত্ব এবং চাকরির শর্তাবলী নির্ধারণ, অর্থ সংক্রান্ত বিষয়ে অর্থ কমিটির পরামর্শ বিবেচনা করা সিন্ডিকেট সদস্যদের দায়িত্ব।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য শাহজাহান আলম সাজু বলেন, সিন্ডিকেটে অনেক ক্ষমতা রয়েছে। আইনে অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সিন্ডিকেটকে। সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তের বাইরে উপাচার্যের সাধারণত কিছু করার থাকে না।

রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শহীদুর রশীদ ভুইয়া বলেন, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের অনেক ক্ষমতা রয়েছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সিন্ডিকেট সভায় আমি শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য এজেন্ডা হিসাবে রেখেছিলাম। কিন্তু সিন্ডিকেট সদস্যরা এতে আপত্তি করায় পদোন্নতি দেওয়া যায়নি।’ সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে অনিয়ম, আর্থিক যে দুর্নীতি হয় তা থেকে কি সিন্ডিকেট সদস্যরা দায় এড়াতে পারেন?

দেশের ১০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের ব্যাপারে তদন্ত করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে তা হলো নিয়োগে অনিয়ম, আর্থিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব উপাচার্য সিন্ডিকেট সদস্যদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে অনিয়ম করেছেন। এসব অনিয়ম করার সুযোগ দিয়ে সুবিধা নিয়েছেন কোন কোন সিন্ডিকেট সদস্য।

এক সিন্ডিকেট সদস্য বলেন, সিন্ডিকেট সদস্যরা নিয়মমাফিক ভূমিকায় থাকলে উপাচার্যরা তেমন অনিয়ম দুর্নীতি করতে পারেন না। কিন্তু উপাচার্যের অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রয়েছেন কোনো কোনো সদস্য।

তথ্য অনুযায়ী, সিন্ডিকেটে বড় একটি অংশে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। উপাচার্য তার নিজের লোককে কৌশলে সিন্ডিকেট সদস্য করেন। এর বাইরে যাদের সদস্য করার জন্য উপাচার্য মন্ত্রণালয়ে যাদের নামের প্রস্তাব পাঠান তারাও উপাচার্যের ঘনিষ্ট জন। আর মন্ত্রণালয়ের যেসব কর্মকর্তা সিন্ডিকেট সদস্য হন তাদের কৌশলে ম্যানেজ করেন কোনো কোনো উপাচার্য। কোনো কোনো সদস্যকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে, কোনো কোনো সদস্যকে নিয়োগের সুযোগ দিয়ে উপাচার্য তার অনৈতিক কাজকে জায়েজ করে নেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিন্ডিকেট সদস্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণাধর্মী। তাই আইন অনুযায়ী, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক হিসাবে আমি সদস্য হয়েছিলাম। কিন্তু সভায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আমাকে কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ দেওয়া হয় না। সবকিছু পরিকল্পিতভাবে থাকে। যেসব সদস্য সভায় কথা বলেন, বা ভূমিকা রাখতে চেষ্টা করেন তার সঙ্গে আগেই কথা হয় উপাচার্যের। বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডার, নিয়োগসহ নানা ধরনের কাজ থাকে। তাকে হয়তো কোনো সুবিধা দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, সিন্ডিকেট সদস্যরা চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম দুর্নীতি আটকাতে পারেন। এছাড়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের আমলারা সিন্ডিকেট সদস্য হন। তারা নিয়মিত সভায় যান না। তাদের অনুপস্থিতি ও মতামত ছাড়াই সিদ্ধান্ত পাশ হয়। কোনো কোনো সদস্য সভায় নীরব থাকেন। কেউ কেউ নানা ধরনের সুবিধাও নিতে পারেন। আর যেসব শিক্ষক সদস্য হন তারাও উপাচার্যের মতের বাইরে কিছু বলেন না।

ইত্তেফাক/কেকে