আমি তাঁর পাশে থাকতে পারিনি

৮ জুনের ‘ইত্তেফাকে’ সদরি ইস্পাহানি সাহেবের বক্তব্য পড়ে আমি নতুন করে জানতে পারলাম, আমার স্বামী বিনা চিকিৎসায়, বিনা সেবায় আপন পরিজনের চোখের আড়ালে অসহায় অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের প্রশ্নটি নিয়ে পর্যন্ত তাঁরা সবাই সন্দেহ-বিশ্বাসের দ্বন্দ্বে ছিলেন।

আমার স্বামী ‘পিণ্ডিতে আরও কিছুদিন থাকবেন, তাই আমাকে ঢাকা থেকে ট্রাঙ্ককল করে নেওয়ালেন। দীর্ঘ দূরত্ব পেরিয়ে আমি তাঁর কাছে গেলাম। জানি না, তিনি তাঁর নিজের অজান্তে এই পরিণামের জন্য প্রস্তুত ছিলেন কিনা। আমি গেলাম, কিন্তু তাঁর অন্তিম মুহূর্তে আমি তাঁর পাশে উপস্থিত থাকতে পারলাম না, এ যে আমার কতবড় দুর্ভাগ্য, সে-কথা বুঝাব কি করে।

শুক্রবার রাতে আমি ‘পিণ্ডি পৌঁছি। প্লেন থেকে নামতেই দেখি, তিনি বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আমার জন্য এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছেন। হাসিমুখে তিনি এগিয়ে এলেন, ঢাকার কুশল সংবাদ নিলেন, তারপর আমরা ‘ফ্ল্যাশম্যান’ হোটেলে গেলাম।

পরদিন শনিবার সকাল ৯টায় আমাকে নিয়ে তিনি বেড়াতে বেরুলেন। ঘুরে-ফিরে আমরা কিছু কেনা-কাটাও করলাম। তিনি নিজে পছন্দ করে নাতিদের জন্য কিছু জামা-কাপড় ইত্যাদি কিনলেন। সারাদিন তাঁকে সব কাজে, সব কথায় উৎফুল্ল মনে হয়েছে। মনে হচ্ছিল, ‘পিণ্ডিতে এসে এই ক’দিইে তিনি যেন আরও সুস্থ হয়ে উঠেছেন। দুপুরে খাওয়া সেরে হোটেল কক্ষেই বিশ্রাম নিলেন। তারপর বিকালের দিকে আমরা ইসলামাবাদ ঘুরে আরও কিছু কেনাকাটা করে হোটেলে ফিরলাম। সারাক্ষণ তাঁর মুখে কথা ছিল। ওখানকার বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে আরোচনা করছিলেন, আবার ছেলে-মেয়ে-নাতিদের কথাও বলছিলেন। বাড়ি ফেরার কথায় তিনি বললেন, রবিবার নারী বেড়িয়ে সোমবার ঢাকা রওয়ানা করবেন।

রাতে আমরা খাওয়া সেরে ঘুমাবার প্রস্ততি নিয়ে নিজ নিজ বিছানায় গেলাম। তিনি খবরের কাগজ পড়লেন প্রায় আধা ঘণ্টা খানেক। তারপর লাইট ‘অফ’ করে আমরা ঘুমাতে গেলাম। রাত তখন প্রায় এগারোটা। হঠাত্ টেলিফোন বেজে উঠলো। এর মধ্যেই তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। টেলিফোনের শব্দে তন্দ্রাচ্ছান্নভাবে টেলিফোন ধরলেন। জিজ্ঞেস করলাম, কার টেলিফোন? বললেন, ‘সউদ। ওরা আমার জন্য বসে আছে।’

এডিটর সাহেব সউদের কথা বলিয়া ছিলেন, না সদবীর কথা—এ প্রশ্নের জবাবে মিসেস হোসেন বলেন, আমার যেন মনে হল, তিনি সউদের কথা বললেন। তবে, আমার শোনার ভুলও হতে পারে)। বিছানা ছেড়ে উঠে তিনি ব্যস্তভাবে তৈরি হলেন বাইরে যাওয়ার জন্য। আমি গাড়ি আছে কিনা জিজ্ঞেস করলে জবাবে বললেন, ‘কাছেই যেতে হবে, গাড়ী পাওয়া যাবে।’

শেষবারের মত তিনি আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন; ভাবলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ফিরে আসবেন। কিন্তু কে জানত, এই বিদায়ই তাঁর শেষ বিদায়। আমি তাঁর আসার অপেক্ষায় সময় গুণছিলাম, এমন সময় আবার টেলিফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে কে যেন বাংলায় বললেন, ‘আমি সউদ বলছি।’ (সউদ, না সদির— এ প্রশ্নের জবাবে মিসেস হোসেন বলেন, ‘আমি যেন ‘সউদই শুনেছি। তবে আগেই বলেছি, আমার শোনার ভুলও হতে পারে।’)

যা হোক, টেলিফোনের ওপ্রান্ত থেকে তিনি বললেন, ‘মানিক ভাই একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, আপনি আসতে পারেন?’ আমি বললাম, ‘আমি একা কি করে আসব, গাড়ি পাঠান।’ আমার জানা ছিল না তিনি কোথায় আছেন। অজানা আশঙ্কার মধ্যে আমি অস্থির হয়ে সামনের বারান্দায় তখন পায়চারি করছি। গাড়ি এলো বেশি কিছুক্ষণ পর। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে উঠে বসলাম। আমার ধারণা ছিল ড্রাইভারই জানে আমাকে কারা নিয়ে পাঠিয়েছেন এবং কোথায় নিয়ে যাবে। অথচ কিছুদূর যেতেই ড্রাইভার উর্দুতে আমার কাছে জানতে চাইল আমি কোথায় যাব। শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। অধীরভাবে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমাকে কে পাঠিয়েছেন?’ ও বলল, ‘ইস্পাহানি সাব পাঠিয়েছে।’ ইস্পাহানির নাম শুনে আমি আরও বিচলিত হয়ে পড়লাম; কারণ, টেলিফোনে আমি যেন সউদ সাহেবের নাম শুনেছিলাম। ড্রাইভার ঠিক আমার বাংলা কথা বুঝছিল না।

আমিও ওর কথা বুঝতে পারছিলাম না। তখন ড্রাইভারকে বুঝিয়ে আমি ‘ফ্লাশম্যানে’ ফিরে গেলাম ও একজন বাঙালি লোককে ডেকে আনতে বললাম। সেই বাঙালি ছেলেটির মাধ্যমেই আমি বুঝতে পারলাম, ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে ফোন করা হয়েছে। আমি তখন সোজা ইন্টারকন্টিনেন্টালে গেলাম। ওখানে পৌঁছে আমি কাউকে কোথাও দেখলাম না। ভেতরে ঢুকে রিসেপশন রুম দেখে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। জানতে চাইলাম, ইত্তেফাক এডিটর মানিক মিয়া সাহেব কোন রুমে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সেখান থেকেও আমি সঠিক কোনো জবাব পেলাম না। তখন পর্যন্ত আমার সাথে সেই বাঙালি ছেলেটা ছিল। আমার তখন খেয়াল হলো, ইস্ট পাকিস্তান হাউজে আতাউর রহমান সাহেব আছেন। আমি সোজা ড্রাইভারকে নিয়ে তাঁর কাছে গেলাম।

রিসেপশন থেকে আতাউর রহমান সাহেবের রুম নম্বর নিয়ে তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে আমার সাথে আসার জন্য অনুরোধ জানালাম। তিনিও ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না, কোথায় যাবেন। তখন আমিই বললাম, ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে যখন ফোন করা হয়েছে, তখন সেখানেই চলুন। সেখানে যাবার পর দেখি, এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি মিসেস মানিক মিয়া?’ তারপর তাঁর সাহায্যেই আমি ও আতাউর রহমান সাহেব সদির ইস্পাহানি সাহেবের রুমে গেলাম। রুমে ঢুকে দেখি, সব শেষ। আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে ঢাকা অবস্থায় আমার স্বামী ঘুমিয়ে আছেন—যে ঘুম আর কোনকালেও কারো ডাকে আর ভাঙবে না। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে তাঁর শয্যাপার্শ্বে গিয়ে বসে রইলাম, স্তব্ধ-বিমূঢ়।

সামান্য একটু মাথা ধরলেও যিনি আমাকে অস্থির-উতলা করে তুলতেন ওষুধের জন্য, একা বিছানায় ছটফট করে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন—নিঃসঙ্গতা কাটাবার জন্য যিনি এতদূর থেকে আমাকে ‘পিণ্ডিতে ডেকে নিলেন, তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত সময়টিতে আমি তাঁর পাশে থাকতে পারলাম না, কার দোষে, কার ভুলে—এ প্রশ্নের জবাব কি? ড. ববের দেওয়া ওষুধ আমার কাছেই ছিল—সে ওষুধ আমি ‘পিণ্ডিতেও নিয়ে গিয়েছি—শেষ মুহূর্তে উত্লা হয়ে অসহায়ের মত তিনি নাকি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন, হয়তো-বা আমারই খোঁজ করছিলেন, হয়তো-বা ভেবেছিলেন, আমি আসলেই ওষুধের ব্যবস্থা হবে, তাঁর কষ্টের লাঘব হবে। কিন্তু কৈ, সে ফুরসৎ, সে সুযোগ আমি পেলাম কোথায়।

সান্ত্বনার সন্ধানে মৃত স্বামীর পাশে বসে আমি অনবরত তাঁর বুকে-মুখে, হাতে-পায়ে হাত বুলিয়েছি, হয়তো-বা তাঁর অতৃপ্ত আত্মা তখনও আমার সেবা-যত্নের অপেক্ষা করছিল। যাঁরা তখনও মুর্দার ঘরে ছিলেন, এক এক করে তাঁরা সবাই যে যাঁর ঘরে চলে গেলেন—বাকি রাতটুকু একেবারে একা মৃত স্বামীর লাশের পাশে বসে আমাকে কাটাতে হল।

অবুঝ শিশুর মত খেয়ালী এই মানুষটিকে ঘিরে হোটেল কক্ষে এতকিছু ঘটল, অথচ দু’মিনিটের দূরত্বে থেকেও আমি তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াবার অবকাশ পেলাম না, এ দুঃখ আমি রাখি কোথায়।

এই খেয়ালী মানুষটিকে নিয়েই সারা জীবন আমি সংসার করেছি। সংসারের সব দায়িত্ব, সব কর্তব্য আমার ওপর চাপিয়ে দিয়ে তিনি সব সময়েই বাইরের কাজে ব্যস্ত থেকেছেন। আপত্তি জানায়ে বলেছেন, ‘দেশ বড়, না সংসার বড়। সংসার নিয়ে তোমরা থাক, আমাকে দেশের ব্যাপারে চিন্তা করতে দাও।’ —সে চিন্তায় আমরা বাধা সৃষ্টি করতে চাইনি। আর চাইনি বলেই কি আজ এই পরিণাম।

জীবনে যেমন, মরণেও তেমনি সব দায়িত্ব আমার ওপর চাপিয়ে তিনি বিদায় নিয়ে গেলেন—স্নেহময় পিতার শেষ দর্শন থেকে ব্যথাতুর পুত্র-কন্যাদের বঞ্চিত করতে পারব না জেনেই সারারাত আমি তাঁর লাশ পাহারা দিয়ে কাটিয়েছি—‘পিণ্ডি থেকে বয়ে এনে পৌঁছে দিয়েছি তাঁদের স্নেহচ্ছায়ায়। দেশের জন্য, দশের জন্য ‘মোসাফিরের’ যে জীবন তিনি বেছে নিয়েছিলেন, সুদূর ‘পিণ্ডির হোটেল কক্ষে ‘মোসাফিরের’ মতই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হয়তো-বা সেই জীবনের সার্থকতাই তিনি খুঁজে পেয়েছেন। হয়তো তা-ই তিনি চেয়েছিলেন।

লেখক: তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সহধর্মিণী ও ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান

প্রকাশকাল: ৯ জুন ১৯৬৯

ইত্তেফাক/কেকে