মানিক মিয়া নাই। তার আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুতে আমরা সকলেই অত্যন্ত মর্মাহত— সারাদেশ তাঁর মৃত্যুতে শোকসন্তপ্ত। মানিক মিয়া দেহত্যাগ করে থাকলেও তাঁর বিদেহী আত্মা আমাদের পরিত্যাগ করে নাই— আমাদের চারদিকে ঘিরে আছে ও বহুদিন পর্যন্ত থাকছে। তাঁর কথা, তাঁর লেখা, তাঁর চিন্তাধারা, যুক্তিতর্ক সব কিছুই আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে থাকবে। জীবনে তাঁকে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করেছি, অনেকেই করেছেন। মৃত্যুর পর তিনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। আমরা যারা তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করেছি, সুখে-দুঃখে, আনন্দে-বিষাদে, শান্তি-কলমে, অনেক কথা বলেছি ও শুনেছি, তাঁদের জীবনে মানিক মিয়ার তিরোধান একটা বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। জাতির জীবনে একটা অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। মানিক মিয়ার সাথে আমার প্রথম পরিচয় একশ’ পঞ্চাশ নম্বর মোঘলটুলিতে— খুব সম্ভব উনিশশ’ উনপঞ্চাশ সালে। তখন আমরা আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেছি এবং মোগলটুলিতে অফিস স্থাপন করেছি। তার আগে কলকাতায় তাঁকে ‘ইত্তেহাদ’ অফিসে দেখেছি। কিন্তু আলাপ-পরিচয় হয় নাই।...
প্রথম থেকেই তাঁর বলিষ্ঠ ও পরিচ্ছন্ন চিন্তাধারা আমাকে আকৃষ্ট করেছে। যেকোন পরিস্থিতি ও অবস্থার মোকাবিলা করার শক্তি ছিল তাঁর অসাধারণ। জীবনের শেষ পর্যন্ত তাঁর এই শক্তি অটল ছিল। অসংখ্য ক্ষুদ্র-বৃহত্ প্রতিকূল অবস্থার ভিতর দিয়ে ধীরে ধীরে তাঁকে অগ্রসর হতে হয়েছে। বিপদ-আপদ-বিপর্যয় কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারে নাই। তিনি আশাবাদী ছিলেন। তাঁর এই আশাবাদের প্রেরণা আমাদেরও উদ্বুদ্ধ করেছে।...
তাঁকে বাদ দিয়ে রাজনীতির কথা আমরা চিন্তা করতে পারি নাই। আওয়ামী লীগ, যুক্তফ্রন্ট, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংস্থার সাথে তাঁর নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কঠিন সমস্যার উদ্ভব হলেই মানিক মিয়ার ডাক পড়েছে। সমাধানের ব্যাপারে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও পরিস্থিতির নির্ভুল বিশ্লেষণ করতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সব সময়ই আমরা গ্রহণ করতে না পারলেও তাঁর বিশ্লেষণের প্রশংসা না করে পারি নাই। রাজনীতির ক্ষেত্রে মতান্তর ঘটা কিছু অস্বাভাবিক নয়। তাঁর সাথে অনেক ব্যাপারে মতবিরোধ ঘটেছে, কথা কাটাকাটি এমনকি চটাচটিও হয়েছে, কিন্তু সে বিরোধ মৌলিক ছিল না...।
আমার প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে নানা কারণে নানা ব্যক্তির সঙ্গে নানা রকমের ছোটবড় কোন্দলের সৃষ্টি হয়েছে। মানিক মিয়া এসব ব্যাপারে আমাকে যে সহায়তা করেছেন নিরাশ-মনে উত্সাহ দিয়েছেন, তা কোনদিন ভুলতে পারব না। কোন্দলের অবসানও অনেক সময় একা, অনেক সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাধ্যমে ঘটিয়েছেন।
মানিক মিয়ার আশাবাদী মনোভাবের কথা আগেই বলেছি। এসব দুর্জয় আশাবাদী লোক আমি খুব কম দেখেছি। কোন কিছুই তাকে নিরাশ করতে পারে নাই। আটান্ন সালে আইয়ুব শাসন শুরু হওয়ার পর জাতির জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। ভবিষ্যত্ অন্ধকার, আমরা অসহায়। নিরাশ মনে হা-হতাশ করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। মানিক মিয়া গোড়া থেকেই আমাদের উত্সাহিত করেছেন। বলেছেন, এটা একদম সাময়িক ব্যাপার। কয়দিনই-বা এদের আয়ু।... তার সাংবাদিক জীবনে দুর্যোগ ঘনঘটা বারবার আচ্ছন্ন করেছে তার জীবনকে। তিনি দুঃখ করেছেন কিন্তু নিরাশ হতে তাকে কখনও দেখি নাই। হয়ত তার অবচেতন মনে দুরন্ত আঘাত লেগেছে, চেতন মন তা টেরই পায় নাই। অলক্ষ্যে এই আঘাত তার হূদয়কে তার অজ্ঞাতে বিদীর্ণ করে দিয়েছে ব্যাধির কষ্ট হয়েছে হূদয়বন্দরে এবং শেষ পর্যন্ত তার জীবননাশও করেছে। কিন্তু সজ্ঞানে তিনি তাকে গ্রহণ করে নেন নাই।...
সাংবাদিক জীবনে তিনি একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে পড়েছিলেন। তার লেখার তরী তারই নিজস্বতার ভাগ্য ও তার নিজস্ব অননুকরণীয়। এই ভাষার স্রষ্টা তিনি নিজে। যা তিনি বিশ্বাস করতেন ভুল হোক না শুদ্ধ হোক জোরালো ভাষার অকুতোভয়ে তা লিখে ফেলতেন। তার জন্য বারবার বিপদগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হন নাই কিংবা কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন নাই। সরকারী মহলের দালালরা তাকে কতবার তোয়াজ করার চেষ্টা করেছে তার কর্ম ও চিন্তাধারার যিকঞ্চিত্ করার জন্য এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার আশ্বাসও দিয়েছে কিন্তু তিনি তার নীতি বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতে রাজি হন নাই। একবার আমাকে বললেন দেখুন, একটু নরম হলেই বিপদমুক্ত হতে পারি কিন্তু এটাতো সম্ভব নয়। নীতির পরিবর্তন করে আপোষ করা আমার কল্পনার বাইরে। কপালে যা আছে তাই হবে। না হয় সাংবাদিকতা ছেরেই দেব, কিন্তু তাই বলে মানুষের কাছে ছোট হতে পারব না। সারাদেশ আমার নীতির সঙ্গে পরিচিত। হঠাত্ স্বার্থসিদ্ধির জন্য তা পাল্টাই কেমন করে। মানিক মিয়া বদলে গেছে এই অপরাধ আমার কাছে মৃত্যু তুল্য।
এই অনমনীয় মনোভাবই মানিক মিয়ার আসল পরিচয়।... তার মৃত্যু ঘটতে পারে না। সে অমর। মানিক মিয়ার সম্বন্ধে এই কথা মনে করেই আমরা সান্ত্বনা লাভ করতে পারব। (সংক্ষেপিত)
লেখক ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, পূর্ব পাকিস্তান
প্রকাশকাল: ১৪ জুন ১৯৬৯
ইত্তেফাক/কেকে