মোজাম্মেল হক নিয়োগী
কথা ছিল বিলের পূর্ব-উত্তর পাশের একটি উঁচু মাটির ঢিবির নিচ থেকে ফাল্গুনের শেষে শীতনিদ্রা থেকে জেগে উঠবে। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই মাঘের মাঝামাঝিতে উঁচু ঢিবিটি কেটে বিলের প্রায় মাঝখানে একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয় যাতে বর্ষার ঢলে দক্ষিণ পাশের ফসল নষ্ট না হয়। অসময়ে নিদ্রা ভাঙলে মানুষ যেমন ক্রোধে আক্রোশে শিমুল তুলোর বাকলের মতো ফেটে যায় ঠিক তেমনই ব্যাঙটি ক্রোধে ফেটে পড়ে। অবশ্যই নিদ্রাভঙ্গের জন্য যে সে ক্রদ্ধ হয়েছিল ঠিক তা নয়। অন্য একটি রহস্যজনক ঘটনার জন্য সে ক্রদ্ধ হয়েছিল। সে কথাই বলছি। বিলের মাঝ বরাবর বাঁধ দেওয়ার আগে বর্ষাকালে ব্যাঙটি ওপাশে তার প্রেমিকার কাছে অবাধে যেতে পারত; বাঁধের কারণে এখন আর সম্ভব নয়। মাথা কি আর এমনি এমনি খারাপ হয়? প্রচণ্ড আক্রোশে ব্যাঙটি ফুলতে থাকে। ফুলতেই থাকে। একসময় বাঁধ নির্মাতা প্রকৌশলীর ডান পায়ে কামড় দিয়ে প্রায় গিলে ফেলে। এমন সময় করুণ চোখে তাকিয়ে ভয়ার্ত কণ্ঠে ব্যাঙকে জিজ্ঞেস করল, তুমি আমার পা কামড়ে ধরেছ কেন?
ব্যাঙ ভাবছে কথা বললেই মুখ হাঁ হবে এবং ব্যাটা পালিয়ে যাবে। তবে উত্তর না দেওয়াও অভদ্রতা ভেবে পা ছেড়ে বলল, এই বাঁধ দেওয়াতে আমি আমার প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে পারব না। কথাটি শেষ করতে না করতেই প্রকৌশলী লাফ দিয়ে দূরে সরে গিয়ে ভেবেছিল দৌড়ে পালাবে কিন্তু সেই সুযোগ ব্যাঙটি দেয়নি। সে পুনরায় পা কামড়ে ধরে আস্তে আস্তে গিলতে থাকে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় প্রকৌশলী দেখছে তার প্রায় কোমর পর্যন্ত ব্যাঙের মুখগহ্বরে চলে গেছে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই গিলে ফেলতে পারে। সে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, আসলে যে বাঁধটি দেওয়া হয়েছে এটি বালির। বর্ষার প্রথম ঢলেই কিন্তু পানির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। তখন তোমার প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে কোনো অসুবিধাই হবে না।
ব্যাঙ বলল, কথা ঠিক তো?
খুব ঠিক। খুব সত্য।
ব্যাঙটি প্রকৌশলীর পা ছেড়ে দেয়। তার ক্রোধ ক্রমশ হ্রাস পায় এবং সে ছোট হয়ে যায়। তিন মাস পরেই একদিন তুমুল বৃষ্টি হয়। ব্যাঙটি লক্ষ করল লোকটির কথা খুব ঠিক।
মেঘ গুরুম মেঘ গুরুম শব্দ হয় আকাশে। বর্ষার পানির সঙ্গে ব্যাঙের প্রজননের নিবিড় সম্পর্ক। ব্যাঙের কণ্ঠনালী ঢোলের মতো স্ফীত হয় এবং সংকুচিত হয়: ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ।