বাল্যবিবাহ নিরোধ ও আইনের বাস্তবায়ন

 ‘বাল্যবিবাহ’ শব্দটা বাংলাদেশে একটা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে কত প্রাণ অকালে ঝড়ে পড়ছে তার হিসাব কি কেউ নিচ্ছে? বাল্যবিবাহের কুফল হিসেবে কত নারী মাতৃত্বজনিত সমস্যা, অপুষ্টি ও জরায়ুর ক্যানসার বা কঠিন কোনো রোগে মারা যাচ্ছে। অজ্ঞতার কারণে আগামী প্রজন্ম সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে বাল্যবিবাহ একটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

মানবসমাজের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বলি হলো বাল্যবিবাহ। যেখানে শিক্ষার আলো ছড়ায়নি, সেখানে বাল্যবিবাহের ঘটনা বেশি। যারা অন্ধকারে থাকে, এরা আলোর পথ কীভাবে দেখবে? একটি মেয়ে স্কুলজীবন পেরোনোর আগেই বউ ও মা হচ্ছে। জীবন সম্বন্ধে জানার আগেই সংসারজীবনে প্রবেশ করে। সংসারের ভার বহন করার ক্ষমতা তাদের কতটুকু হয়, সেটা কি অভিভাকদের ভাবনায় আসে?

বাল্যবিবাহের কুফলের কারণে মা হতে গিয়ে প্রতি ২০ মিনিটে একজন মা মারা যাচ্ছেন। তাছাড়া প্রতি বছর গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবকালীন ৬০ হাজার বাল্যবধূ মারা যায়। সম্প্রতি ব্র্যাক, ইউএন উইমেন বাংলাদেশ, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি যৌথভাবে পরিচালিত এক গবেষণার তথ্য মোতাবেক, কভিড-১৯ গত বছরের এপ্রিল—নভেম্বর সময়ে অনুষ্ঠিত বিয়ের মধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ (৭৭ শতাংশ) কনের বয়স ১৮-এর নিচে, যা ২০১৮ সালের জরিপ জাতীয় বাল্যবিবাহের হারের (৫১ শতাংশ) চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি, শহরের (৭০ শতাংশ) তুলনায় গ্রামে (৮১ শতাংশ) বাল্যবিবাহের ঘটনা বেশি ঘটেছে। তাই বিশ্বে বাল্যবিবাহের ব্যাপকতায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জীবিত প্রায় ৬৫ কোটি নারী বাল্যবিবাহের শিকার। এর প্রায় অর্ধেকই ঘটেছে বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশে। পাঁচটি দেশ হলো ব্রাজিল, বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া, ভারত ও নাইজেরিয়া। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে প্রকাশিত জাতিসংঘের শিশু তহবিলে (ইউনিসেফ) এ তথ্য জানা গেছে। ইউনিসেফের নতুন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাদের ভবিষ্যদ্বাণী এই দশক (২০২০-২০৩০) শেষ হওয়ার আগে অতিরিক্ত ১ কোটি বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটতে পারে। ইউনিসেফের প্রতিনিধির ভাষ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও বাল্যবিবাহ চতুর্থ সর্বোচ্চ বাংলাদেশে। লাখ লাখ মেয়েশিশু যে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, তা আরো জটিল করে তুলেছে কোভিড-১৯। ইউনিসেফের প্রধান নির্বাহীর ভাষ্য অনুযায়ী, এ পরিস্থিতি থেকে উঠে আসতে হলে স্কুল খুলে দেওয়া, নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং আইনি সহায়তা দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন হেনরিয়েট ফোর।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সুন্দর আইনগত কাঠামো আছে। ছেলেমেয়েদের বিয়ের বয়স সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে বাংলাদেশে প্রথম আইন প্রণীত হয় আজ থেকে ৮৮ বছর আগে। ১৯২৯ সালে প্রণীত আইনের নাম বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন। এই আইনে ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করা হয় মেয়েদের জন্য ১৪, ছেলেদের ১৮। ১৯৮৪ সালে এই আইনে পরিবর্তন এনে বিয়ের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করা হয় মেয়েদের জন্য ১৮ বছর, ছেলেদের জন্য ২১। পরে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭তে কিছু সংশোধনী এনে ----এই আইন অনুমোদিত হয়, যা বর্তমানে কার্যকর। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী বাল্যবিবাহের  শাস্তিসমূহ সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো :

(ক) প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করিলে উহা হইবে একটি অপরাধ, তজ্জন্য তিনি অনধিক ৬ মাস কারাদণ্ড অথবা ৩০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন, অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরো এক মাস করে দণ্ডিত হবেন।

 (খ) অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করিলে তিনি অনধিক এক মাসের আটকাদেশ বা ৫০,০০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। (গ) পিতামাতা ও অভিভাবক অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি আইনগতভাবে অথবা আইনবহির্ভূতভাবে কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর কর্তৃত্বসম্পন্ন হইয়া বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করিবার ক্ষেত্রে কোনো কাজ করিলে অথবা করিবার অনুমতি বা নির্দেশ প্রদান করিলে অথবা স্বীয় অবহেলার কারণে বিবাহটি বন্ধ করিতে ব্যর্থ হইলে উহা হইবে অপরাধ, তজ্জন্য ২ বত্সর ও অন্যূন ৬ মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে ৩ মাস অনধিক কারাদণ্ড ভোগ করিবেন। (ঘ) বাল্যবিবাহ পরিচালনাকারী ২ বত্সর অন্যূন ৬ মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরো ৩ মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। (ঙ) বাল্যবিবাহ নিবন্ধনকারী ২ বত্সর অন্যূন ৬ মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনধিক ৩ মাস কারাদণ্ড হইবে। শুধু তাই নহে, নিবন্ধনকারীর লাইসেন্স বাতিল অথবা নিয়োগ বাতিল হইবে। শুধু আইন দিয়ে তা প্রতিহত করা যাবে না, সামাজিকভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, দৃষ্টিভঙ্গী বদলানোর জন্য এটা সবার নৈতিক দায়িত্ব। মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে, স্কুলের কিশোরী ছাত্রীরা এগিয়ে আসে বান্ধবীর বাল্যবিবাহ ভণ্ডুল করার লক্ষ্যে। এরা সফলও হয়।  তখন  কিন্তু মনে আশার আলো জাগে। সারা দেশ এমনি করে জেগে উঠলে আইনের প্রয়োজন হয় কি?

n লেখক :ব্যাংকার, কলামিস্ট