খরস্রোতের তেঁতুলিয়া নদী ভোলা ও পটুয়াখালী জেলার মধ্যে অবস্থিত দুর্গম চরাঞ্চল। এই নদীর মধ্যে জেগে উঠে চরবোরহান, চরশাহজালাল, চরহাদি, চরবাঁশবাড়িয়াসহ প্রায় ১৭টি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল।
জোয়ার-ভাটায় ডুবে যাওয়া এসব চরাঞ্চলে ১৯৮৮ সালে ভিটেমাটি হারানো সহায় সম্বলহীনদের বসতি গড়ে ওঠে। এখন ঐ চরাঞ্চলে প্রায় ১৫ হাজার লোকের বসবাস। তাদেরই একজন চরহাদির সবুরা বিবি। সবুরা বিবির স্বামী হবি। হবি কোন নামের সংক্ষিপ্ত আজ নিজেও জানেন না তিনি। ভিটেমাটি আর সহায় সম্বলের মতো হারিয়ে গেছে স্বামীর ভালো নাম। ঘূর্ণিঝড় এলেই স্বজন হারানোর ভয়ে কাবু হয়ে থাকে সবুরা-হবিরা। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের প্লাবনে ফসলহানি নিত্যসঙ্গী হয়ে আছে।
ছবি: ইত্তেফাক
প্রতিবারের মতো এবারও ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ও বুদ্ধ পূর্ণিমায় ক্ষতিগ্রস্ত সবুরা বিবি ও হবি পরিবার। সবুরা বিবির স্বামী হবি গ্যাস্ট্রিক রোগাক্রান্ত ঘরে পড়ে আছে। সবুরারা দুই স্ত্রী ও তাদের বহু সন্তান নিয়ে অভাবে অনটনে দিন কাটাচ্ছে। এজন্য বাবা-মা ছেড়ে সন্তানদের ভিন্ন সংসার। খাদ্য সহায়তা নিতে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে নদীর পাড়ে আসে সবুরা। বয়সের ভারে কুঁজো সবুরা খাদ্য সহায়তা কুঁজে করে বয়ে নিয়ে যায় কষ্টেশিষ্টে। সবুরা বিবির মতোই অসহায় আমিরজান ও রৌজেআলী, নুর চেহেরা ও লাল মিয়া, আরতী রানী ও মহানন্দ এবং জানু বেগম ও নাসিরসহ হাজারো পরিবার।
চরহাদির আনজাত আলী বলেন, ‘চরে আওনের পর থেইক্কা জোয়ার আর বানের পানিতে ডুইব্বা ভাইসা বাইচ্চা আছি। রাস্তাঘাট না থাহায় বইন্না আইলে পরানডা টিবটিব করে এই বুঝি মর্ইরা গ্যালাম।’
বানের জলে প্রতি বছর ফসলহানির ফলে অর্ধাহার অনাহারে কাটাতে হয় বললেন এ চরের আনজাত আলী। এফ্রাজ হাওলাদার বলেন, ‘বইন্না অইলে পানি ঘোলা থাহায় ভাত খাওনের পর খাউন্না পানি থাহেনা।’
দাদন রাড়ীর দাবি, জেলা সীমানা বিরোধের ঘটনায় প্রতি বছর ফসল লুট হওয়া বন্যার ঘটনার চেয়েও ভয়াবহ।
ছবি: ইত্তেফাক
এসব চরাঞ্চলে বসবাসরত পরিবারের নানা অভাবের কথা শোনা যায়। চরাঞ্চল চরবোরহান ও চরশাহজালল নিয়ে চরবোরহান ইউনিয়ন গঠিত হওয়ার পর কিছু সড়ক নির্মাণ করা হলেও বেড়িবাঁধ নির্মাণ হয়নি। এ চরে প্রায় সাড়ে ৪হাজার পরিবারের বসবাস। সদর ইউইনয়নের ৯নং ওয়ার্ড চরহাদিতে প্রায় সাড়ে ৫’শ পরিবার বাস করেন। ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ও বুদ্ধ পূর্ণিমার জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পরিবারের মধ্যে উপজেলা প্রশাসন পর্যায়ক্রমে খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসছে।
চরবোরহান ইউনিয়নে ৬’শ ও চরহাদিতে ৪’শ পরিবার ইতিমধ্যে খাদ্য সহায়তা পেয়েছেন। চরহাদিতে সোমবার বিকালে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার সময় এসব দুর্দশার কথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল-আমিনকে জানান এসব চরাঞ্চলের বসতিরা।
চরহাদি ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বেল্লাল আহম্মেদ জানান, ঘূর্ণিঝড় ইয়াস মোকাবিলায় এখানকার লোকজন সাইক্লোন সেল্টারে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও বাবা-স্বামীর ভিটে ছেড়ে যেতে কেউই ঘর ছাড়েনি। সাড়ে ৫’শ পরিবারই প্লাবনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
খাদ্য সহায়তা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন-উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাফর আহমেদ, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রবিউল হেসেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও দশমিনা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাড. ইকবাল মাহমুদ লিটন, জেলা পরিষদের সদস্য মো. জাকির হোসেন ভুট্টো ও দশমিনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুল ইসলাম সোহাগ প্রমুখ।
ইত্তেফাক/এএএম