জলবায়ু পরিবর্তন :ব্যক্তি উদ্যোগের গুরুত্ব কম নয়

পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। হঠাত্ করেই আশির দশক থেকে ইউরোপে তাপমাত্রা বৃদ্ধি শুরু হয়েছে। পৃথিবীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘনঘন হচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এবং আমেরিকায় বিভিন্ন ধরনের ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অস্বাভাবিক তুষারপাত, অগ্ন্যুত্পাত, অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টির মাত্রা বেড়ে চলেছে। আর প্রকৃতির এ অস্বাভাবিক আচরণ ও রুদ্র মূর্তির জন্য মাত্রাতিরিক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসারণকে দায়ী করা হচ্ছে। এর প্রভাব থেকে রক্ষার জন্য উন্নত রাষ্ট্র ও যারা কার্বন নিঃসারণের জন্য দায়ী, তাদের কাছ থেকে যথোপযুক্ত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর তাই তো, গত ২২ এপ্রিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ডাকা ভার্চুয়াল জলবায়ু সম্মেলনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখতে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সবুজ অর্থনীতি ও দেশগুলোর মধ্যে কার্বন প্রশমন প্রযুক্তি বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব প্রদান করেছেন।

আসলেই খুব দৃশ্যমানভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো নজরে আসছে। মরুভূমি বলতেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে জন বসতিহীন বিস্তীর্ণ ধুধু তপ্ত বালুকারাশি। কিন্তু এ চিরচেনা রূপ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সাহারা মরুভূমিতে সবুজের সন্ধান পেয়েছেন। হিমশীতল অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশেও গাছ জন্মাতে দেখা যাচ্ছে। মরুভূমি ও বরফঢাকা সফেদ ভূমিতে সবুজের আগমন পরিবেশবিজ্ঞানীদের একটু ভাবিয়েই তুলছে বইকি! আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি, শীতকালে যত ঠান্ডাই পড়ুক, সকালের সূর্য ধীরে ধীরে কুয়াশা সরিয়ে আকাশে দীপ্যমান হয়। আর এখন শীতকালে দিনের পর দিন সূর্যের দেখাই পাওয়া যায় না। শীতে রোদ পোহানোর স্মৃতি এখনকার প্রজন্মের বাচ্চাদের ভাবনাতেও হয়তো নেই। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কেমন যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে।

সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে সচেতন মানুষেরাও মনে করি জলবায়ু পরিবর্তন বা এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাববার জন্য রাষ্ট্র, জাতিসংঘ, বহুজাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও বিশেষজ্ঞগণ আছেন, এটা তাদের বিষয়। এতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের করণীয় কিছু নেই। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের এ লাগামকে টেনে ধরতে ব্যক্তি উদ্যোগেরও যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।

এই যেমন প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার আমাদের জীবনযাপনের অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। টুথ ব্রাশ, কটন বাড থেকে শুরু করে থালাবাসন, বাসার ছাদের পানি ট্যাংক সবই প্লাস্টিকের তৈরি। বিশ্বে প্রতি মিনিটে প্রায় ৫ লাখ প্লাস্টিক বোতল বিক্রি হচ্ছে। এ প্লাস্টিক আমাদের দিনযাপনকে যেমন সহজ করেছে, একইভাবে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সব প্রাণী, পরিবেশ সর্বোপরি এ ধরিত্রীকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কৃষকের চাষের জমি, পুকুর, রাস্তাঘাট প্লাস্টিক বর্জ্যে ভরে আছে। শুধু ঢাকা শহরেই প্রতিদিন ১ কোটি ২০ লাখ পলিব্যাগ পরিত্যক্ত হয়ে পুকুর, ডোবা, নদীনালা ও সাগরে গিয়ে পড়ছে। বিবিসি নিউজ বলছে, বিশ্ব জুড়ে এখন বছরে ৮০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরে গিয়ে পড়ে, ২০৫০ সালের দিকে এ হিসাব গিয়ে দাঁড়াবে বছরে ১ কোটি ৩০ লাখ টনে। এই যে পলিথিন, পলিব্যাগ ডোবানালা, খালবিল, রাস্তাঘাটে পড়ে থাকছে, জলাবদ্ধতা থেকে শুরু করে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে, সেটা কিন্তু এখানেই শেষ হচ্ছে না। সমুদ্রে গিয়ে পড়া এসব পলিব্যাগ, পলিথিন ধীরে ধীরে সমুদ্রের গতিপ্রকৃতিই পালটে দিচ্ছে, যা প্রকারান্তরে জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে।

আমরা বাসাবাড়ির গৃহস্থালি ও অন্যান্য প্রয়োজনে যেসব প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করি, সেগুলোর বদলে টিন, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, প্রয়োজনে মাটির ভাণ্ড ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। এতে ব্যক্তি ও পরিবার যেমন সুরক্ষা পাবে একইভাবে জলবায়ু ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায়ও নিজেকে শামিল করা যাবে। প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্যের মূল্য কমিয়ে আনতে তত্সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের সহজশর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব ব্যক্তি বা পরিবার প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার ন্যূনতম মাত্রায় নিয়ে আসতে পারবে, তাদেরকে সরকারি তরফ থেকে পুরস্কার ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। এসি বা রেফ্রিজারেটরের ব্যবহার কমাতে পারলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ কমানো সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্র ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এক গবেষণায় বলছে, মুদিপণ্য বহনের জন্য যেসব ব্যাগ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো প্রকৃতিতে মিশে যেতে ২০ বছর সময় লাগে। চা, কফি, জুস, কিংবা কোমল পানীয়ের জন্য যেসব প্লাস্টিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয় সেগুলো ৫০ বছর আর ডায়াপার ও প্লাস্টিক বোতল ৪৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। এখন তো জলবায়ু পরিবর্তনে প্রাকৃতিক কারণ অপেক্ষা মনুষ্যসৃষ্ট কারণগুলোই মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে, আর প্লাস্টিক বর্জ্য এর মাত্রাকে শুধু বাড়িয়েই চলেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল থেকে বাঁচতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের লাগাম টেনে ধরতে গাছ, বৃক্ষ, উদ্ভিদ, লতাপাতা একটি বড় ভূমিকা পালন করে, সে তো আমরা সবাই জানি। বহু আগে থেকে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাছ লাগানোর বিপ্লব সূচিত হয়েছে। রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, বাসাবাড়ি এবং ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগানো হচ্ছে। সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমও বেশ জোরেশোরে চলছে। কিছুদিন থেকে শহর এলাকায় ছাদবাগান কার্যক্রমও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এটা কিন্তু শহর এলাকার বায়ুদূষণ প্রতিরোধে একটি বড় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

বিশ্বে প্রতি বছর যে পরিমাণ খাবারের অপচয় হয় তা উত্পাদনে ১৪০ কোটি হেক্টর জমি ব্যবহূত হয়, যা বিশ্বের মোট কৃষিজমির ২৮ শতাংশ। এ বাড়তি ও অপচয়কৃত খাবার উত্পাদনে বনভূমি নষ্ট করে কৃষিজমি বাড়ানো হচ্ছে, যা পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত করছে। প্রতি বছর অপচয়কৃত খাবারের কারণে ৩৩০ কোটি টন কার্বন ডাইঅক্সাইড বাতাসে ছড়াচ্ছে। ঘরের আশপাশে যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা, কফ-থুতু ফেলা, পরিবেশ ও জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। এ বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্ন ও আলাদাভাবে দেখলে নগণ্য ও গুরুত্বহীন মনে হতে পারে, কিন্তু বিশ্বের প্রায় ৮০০ কোটি জনসমষ্টির কিয়দংশের অসর্তক আচরণের সামগ্রিক যোগফল কত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী হতে পারে, সে হিসাব কি কষে দেখা হয়েছে?

পৃথিবীর অনেক দেশ জলবায়ু বিপর্যয় রোধে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও পাইলট প্রজেক্ট গ্রহণ করছে। সৌদি আরব কার্বন নিঃসারণসহ সব ধরনের দূষণহীন অত্যাধুনিক সুযোগসুবিধা-সংবলিত ২৬ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটারে আয়তনের একটি শহর তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এটি তৈরি হতে ১০ বছর সময় লাগবে। সম্পূর্ণ দূষণহীন এ শহরটিতে কোনো গাড়ি চলবে না, প্রায় ৩৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ও আধুনিক সুযোগসুবিধা-সংবলিত এ শহরটি হবে একটি বিজনেস হাব!

গত বছর অক্টোবরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘মিডনাইট স্যারভাইভাল ডেডলাইন ফর দ্য কাইমেট’ শীর্ষক জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত ফোরামের লিডার্স ইভেন্টে বলেন, ‘আজ আমাদের সময়ের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থান করছি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব আমাদের সভ্যতার ক্ষতি করছে, আমাদের গ্রহকে ধ্বংস করছে এবং আমাদের অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। পৃথিবীকে বাঁচাতে ব্যবস্থা নেওয়ার সময় আজই, আগামীকাল নয়।’

n লেখক : সরকারি চাকরিজীবী