ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে লন্ডভন্ড সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়ন। ফণী, সিডর, বুলবুল, আইলা, আম্ফান, ইয়াসসহ বিভিন্ন সময়ে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে উপকূলীয় এলাকা প্রতাপনগর ইউনিয়ন। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্বান্ত হওয়া এ উপকূলের মানুষ এখন নিজেদের ভিটামাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। প্রতাপনগর ইউনিয়নের শ্রীপুর লঞ্চঘাট এলাকার নরেন্দ্র নাথ দাসের ছেলে তৃপ্তি মোহন দাস (৫০)। তালতলা বাজারে জুতো সেলাই করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতেন। বড় ছেলে হীরালাল দাস প্রতাপনগর ইউনাইটেড একাডেমিতে নবম শ্রেণিতে ও ছোট ছেলে জয় একই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশুনা করত। সিডর, আইলা, আম্ফান, বুলবুল, ফণীর আঘাতে কপোতাক্ষের পাড়ের পৈতৃক ভিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। ইয়াসের প্রভাবে এখন বসতঘরের মধ্যে জোয়ারের পানি উঠলে বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নিতে হয়। ভাটায় পানি কমলে ঘরে গিয়ে রান্না করতে হয়। নামমাত্র ত্রাণ পেয়েছেন। তাতে এক বেলা জোটে তো অপর বেলা জোটে না। এখন বেড়িবাঁধ করার জন্য কোনো প্রকার নোটিশ না দিয়েই তাদেরকে আশ্রয়হীন করা হচ্ছে। তাই সাত পুরুষের আশ্রয় ও ব্যবসা হারিয়ে দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে শনিবার বাগেরহাটের মঙ্গলা থানাধীন দ্বিগরাজে একটি বাসা ভাড়া করে সেখানে রাস্তার ধারে জুতো সারাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রতাপনগরের তালতলা বাজারের শামীম পারভেজ। শ্যামনগরে একটি এনজিওতে কাজ করেন। হতাশার মাঝে বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে সপরিবারে শ্যামনগরের বাধঘাটায় যাচ্ছেন উল্লেখ করে বলেন, এ যাত্রা হয়তো শেষ যাত্রা। যেখানে বারবার ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা যায় না সেখানে থাকা নিরাপদ হবে কি?
প্রতাপনগর গাজী বাড়ির ইসলাম গাজীর ছেলে অজিহার গাজী। চিংড়ি ঘের করেই সংসার চলত। ২০২০ সালের আম্ফানে ভেসে যাওয়া চিংড়ি ঘেরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ইয়াসের প্রভাবে কপোতক্ষের বাঁধভাঙা পানিতে আবারও ভেসে গেল মাছের ঘের। তাই শুধু দুটো ভাতের জ্বালায় চলে যাচ্ছেন খুলনায়। একইভাবে কুড়িকাউনিয়ার আফিলউদ্দিন গাজীর ছেলে স মিলের কর্মী আইয়ুব গাজীর ঘর ইয়াসের প্রভাবে কপোতাক্ষের জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে যাওয়ায় সপরিবারে চলে গেলে যশোরের কেশবপুর উপজেলায়। একই গ্রামের রহমান গাজীর ছেলে রুবেল গাজী সপরিবারে খুলনায়, গোলাপ গাজীর ছেলে পরিচ্ছন্নতা কর্মী কালাম গাজী, ফরমান গাজীর ছেলে দিনমজুর খোকন গাজীও পরিবার-পরিজন নিয়ে চলে গেছেন খুলনায়। একইভাবে কুড়িকাউনিয়ার আনছার ঢালীর ছেলে শ্রীপুর বাজারের মুদি দোকানি আক্তারুল ঢালী সপরিবারে খুলনায় যেয়ে ফুটপাতে চা, পান ও বিড়ি বিক্রি করছেন। এ অবস্থা শুধু শ্রীপুর বা কুড়িকাউনিয়াতে নয়। গোটা প্রতাপনগর ইউনিয়ন জুড়ে একই চিত্র বিরাজ করছে বলে জানালেন বিশিষ্ট সমাজসেবক নূরে আলম ছিদ্দিকি। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে জানান, জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে সুন্দরবন উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে বসবাসকারী মানুষজনের বসবাস করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। সে কারণে আশাশুনির প্রতাপনগর, শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনীসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের লাখো পরিবার আজ হুমকির মুখে সাত পুরুষের ভিটা ছাড়তে চলেছেন। এদের রক্ষায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হাতে না নিলে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে ঐসব অঞ্চল।
আশাশুনি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হুসাইন বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের কারণে উপকূলের বেড়িবাঁধগুলো ভেঙে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ঐ বাঁধগুলো এখনো সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। তাই কিছু কিছু লোক অন্যত্র চলে যাচ্ছে। বাঁধ সংস্কার হলে পানি সরে গেলে তারা পুনরায় ফিরে