২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু পণ্যের করহার কমানো হয়েছে। এতে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে। উল্লেখ্য, বাজেটে শুল্ক-করের প্রস্তাব ঘোষণার পরই কার্যকর হয়।
করোনা কিট :সুরক্ষাসামগ্রীতে শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা আগেই ছিল। এবার করোনা শনাক্তের আরটি-পিসিআর কিট তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে কোভিড-১৯ টেস্ট কিট, পিপিই এবং ভ্যাকসিন আমদানি, উত্পাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে।
কৃষি যন্ত্রপাতি :কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন—থ্রেসার মেশিন, পাওয়ার রিপার, পাওয়ার টিলার, অপারেটেড সিডার, কম্বাইন্ড হারভেস্টর, রোটারি টিলার, উইডার (নিড়ানি) ও উইনোয়ার (ঝাড়াইকল) আমদানিতে আগাম কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তাই এসব পণ্যের দাম কমতে পারে।
মোটরসাইকেল :দেশীয় মোটরসাইকেল উত্পাদন শিল্পের জন্য বিদ্যমান প্রজ্ঞাপনে নতুন কয়েকটি কাঁচামাল অন্তর্ভুক্ত করে এই শিল্পকে প্রসারের জন্য কিছু সংশোধন আনা হয়েছে। চার স্ট্রোকবিশিষ্ট মোটরসাইকেলের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। তাছাড়া দেশে উত্পাদিত মোটরসাইকেলের কাঁচামালের শুল্ক কমানো হয়েছে। তাই মোটরসাইকেলের দাম কমতে পারে। অবশ্য আমদানি করা মোটরসাইকেল কিনতে আগের মতো অর্থ খরচ করতে হবে।
মাইক্রোবাস, হাইব্রিড গাড়ি :নসিমন ও লেগুনার মতো দুর্ঘটনাপ্রবণ যানবাহন ব্যবহার নিরুত্সাহিত করতে সিসিভেদে মাইক্রোবাস আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে। তাই মাইক্রোবাসের দাম কমতে পারে। মাইক্রোবাসকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণপরিবহন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে সরকার। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তব্যে বলেন, ‘মাইক্রোবাস আমদানিতে শুল্কহার কমানোর প্রস্তাব করছি।’ শুধু মাইক্রোবাস নয়, দাম কমবে জ্বালানিসাশ্রয়ী ‘মপেড’ (নকশায় ছোট ও ৫০ সিসির মধ্যে ক্ষমতাসম্পন্ন) মোটরসাইকেলেরও। ‘মপেড’ আমদানিতে শুল্কহার কমানোর প্রস্তাব করছি। পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড গাড়ির ব্যবহার উত্সাহিত করতে এ ধরনের গাড়ি আমদানির ওপর শুল্কহার পুনর্বিন্যাস করার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া ডাম্পার ও টিপার সংযোজনকারী শিল্পের সুরক্ষায় সিকেডি অবস্থায় ডাম্পার বা টিপার আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কহার কমানোর প্রস্তাব করেন তিনি। জ্বালানিবান্ধব গাড়ির দাম কমতে পারে।
কম্পিউটার :স্থানীয়ভাবে কম্পিউটার উত্পাদনে ব্যবহূত কাঁচামাল, উপকরণ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে স্থানীয় কম্পিউটারের দাম কমতে পারে।
স্যানিটারি ন্যাপকিন :স্থানীয় পর্যায়ে উত্পাদিত স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর প্রযোজ্য সমুদয় ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপার উত্পাদনের লক্ষ্যে কতিপয় কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যামান ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দুই বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে।
ওভেন, ওয়াশিং মেশিন :ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ইলেকট্রিক ওভেন, ব্লেন্ডার, জুসার, মিক্সার, গ্রাইন্ডার, ইলেকট্রিক কেটলি, রাইসকুকার, মালটিকুকার ও প্রেসারকুকার উত্পাদনে উপকরণ-যন্ত্রাংশ আমদানিতে ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়েছে। তাই ভবিষ্যতে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে।
রড :রড তৈরির প্রধান উপকরণ স্ক্র্যাপ আমদানিতে আগাম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাছাড়া উত্পাদনকারীদের কর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে। এতে স্থাপনা নির্মাণের প্রধান উপকরণ রডের দাম কিছুটা হলেও কমতে পারে।
সিমেন্ট :রডের মতো সিমেন্ট তৈরির প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকারের অগ্রিম আয়কর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে। তাই সিমেন্টের দামে এর প্রভাব পড়তে পারে।
খেলনা সামগ্রী :দেশে খেলনা উত্পাদনকে উত্সাহিত করতে ৭ ধরনের যন্ত্রাংশ ও উপকরণে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। তাই দেশে তৈরি খেলনার দাম কমতে পারে।
মুড়ি :এবারের বাজেটে মুড়ির ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তাই প্যাকেটজাত মুড়ির দাম কমতে পারে। উত্পাদন পর্যায়ে মুড়ির ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ায় এটি ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে কমবে।
শৌচাগারের প্যান :গ্রামাঞ্চলে মানুষের স্যানিটেশন সুবিধা আরো সুলভ করার লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত ‘লং প্যান’ এর ওপর থেকে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে।
অটিজম সেবা :এ সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মেডিটেশন সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতি এক বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে।
ইস্পাত :ইস্পাতের ওপর সুনির্দিষ্ট শুল্ক টনপ্রতি ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০০ টাকা করা হয়েছে।
মুরগি, মাছের খাবার :পোলট্রি, ডেইরি, ফিশ ফিড উত্পাদনে ব্যবহূত উপকরণ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এতে মুরগি, মাছ ও গবাদি পশুর খাবারের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ক্যানসারের ওষুধ :ক্যানসারের ওষুধ উত্পাদনের কাঁচামালে আবার শুল্ক ছাড় দিয়েছে সরকার। এতে ক্যানসারের ওষুধ উত্পাদনে ব্যয় কমবে। এছাড়া ওষুধ শিল্পের আরো কিছু কাঁচামালে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে।
মেডিক্যাল ডিভাইস :বেশ কিছু মেডিক্যাল যন্ত্রাংশ উত্পাদনে উপকরণ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
দেশি এলপিজি সিলিন্ডার :দেশে এলপিজি সিলিন্ডার উত্পাদনে কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
ডায়ালাইসিসের টিউব : ডায়ালাইসিস সেবায় ব্যবহার করা ব্লাড টিউবিং সেটের কর কমানো হয়েছে।
তাজা ফল :তাজা ফল ব্যবসায়ীদের জন্য সুখবর। ব্যবসায়ী পর্যায়ে ফলের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাই ফলের দাম কমতে পারে।
দেশি মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার :প্রস্তাবিত বাজেটে দাম কমছে উত্পাদন সম্পর্কিত যন্ত্রাংশের। দেশে পণ্য উত্পাদনে যেসব খুচরা যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হবে তার সবগুলো থেকে ভ্যাট ও অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হচ্ছে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে আমদানি নির্ভরতা কাটিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য শিল্পোদ্যোক্তা তৈরিতে এমন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে এসব সেক্টরের যন্ত্রপাতির দাম কমবে। এছাড়া পলিপ্রোপাইলিন স্ট্যাপল ফাইবার, মোবাইল ফোন, স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপারের কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশে উত্পাদিত কম্পিউটারের প্রিন্টার, টোনার কার্টিজ, ইংকজেট কার্টিজ, কম্পিউটার প্রিন্টারের যন্ত্রাংশ, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, এআইও, ডেস্কটপ, নোটবুক, নোটপ্যাড, ট্যাব, সার্ভার, কিবোর্ড, মাউস, বারকোড ও কিউআর কোড স্ক্যানার, পিসিবিএ/মাদারবোর্ড, পাওয়ার ব্যাংক, রাউটার, নেটওয়ার্ক সুইচ, মডেম, নেটওয়ার্ক ডিভাইস/হাব, স্পিকার, সাউন্ড সিস্টেম, ইয়ারফোন, হেডফোন, এসএসডি/পোর্টেবল এসএসডি, হার্ডডিস্ক ড্রাইভ, পেনড্রাইভ, মাইক্রো এসডি কার্ড, ফ্ল্যাশ মেমোরি কার্ড, সিসিটিভি, মনিটর, প্রজেক্টর, প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড, ই-রাইটিং প্যাড, ইউএসবি ক্যাবল, ডিজিটাল ঘড়ি ও পিসিবি উত্পাদনে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে।
বাজেটে অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবে বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে দেশে ব্যবহূত মোবাইল ফোন উত্পাদন ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দুই বছরের জন্য বর্ধিত করার প্রস্তাব করা হলো।