বরাদ্দ বাড়া-কমার চক্রে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাত

গত তিন অর্থবছর ধরে বরাদ্দ বাড়া-কমার চক্রে ঘুরছে দেশের বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাত। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে এর আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে বর্তমান বাজেটে বরাদ্দ কম দেওয়া হয়েছিল।

সংশ্লিষ্টরা এ খাতের উন্নয়ন-চাহিদা এবং সামগ্রিক বাজেট বিবেচনায় এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন। তারা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি, করোনা সংক্রমণের কারণে সেবাসংস্থাগুলো দ্রুত ডিজিটালাইজড করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে যে পরিমাণ বরাদ্দ দরকার ছিল তা দেওয়া হয়নি।

আগামী বছরে বিদ্যুত্ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের জন্য ২৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বর্তমান ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ২৬ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা। এ খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল আগের বছর ২০১৯-২০ সালে। ঐ বছর বিদ্যুত্-জ্বালানি পায় ২৮ হাজার ৫১ কোটি টাকা।

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদায়ি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় প্রস্তাবিত বাজেটের আকার বেড়েছে ১২ শতাংশ। ২০১৯-২০-এর তুলনায় পরের বছর বাজেটের প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ বাড়লেও বিদ্যুত্-জ্বালানি খাতে ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা কম প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুত্ এবং জ্বালানি বিভাগ থেকে ১০৩টি প্রকল্পর জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়। এর মধ্যে বিদ্যুত্ বিভাগের ৭৫টি এবং জ্বালানি বিভাগের ২৮টি প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল।

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে কোভিড-১৯-এর কারণে বিদ্যুত্-জ্বালানি খাতে বরাদ্দ কম রাখার কথা জানিয়েছিল অর্থ বিভাগ। কিন্তু বরাদ্দ কম রাখা হলে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বিঘ্নিত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি বিভাগ। এ বছরও বিদ্যুত্ এবং জ্বালানি বিভাগের ৩৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকার বরাদ্দ চাহিদা পূরণ হয়নি।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, দেশের ‘৯৯ ভাগ’ মানুষের ঘরে এখন বিদ্যুত্ সংযোগ রয়েছে। সরকার এই সেবাকে আরো মানসম্মত করতে উত্পাদন, সঞ্চালন এবং বিতরণ লাইন সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। বক্তৃতায় জানানো হয়, এখন দেশে মোট বিদ্যুত্ উত্পাদন হচ্ছে ২৫ হাজার ২২৭ মেগাওয়াট। ক্যাপটিভ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ এই উত্পাদনের পরিমাণ ২০০৯ সালের তুলনায় পাঁচ গুণ। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে দেশে ১৪ হাজার ১১৫ মেগাওয়াটের ৩৮টি বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আরো ২ হাজার ৯৬১ মেগাওয়াটের ২০টি বিদ্যুেকন্দ্রের চুক্তি সই হয়েছে। এছাড়া ৬৫০ মেগাওয়াটের আরো ছয়টি কেন্দ্রের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন। এসব প্রকল্পের বাইরেও ১৫ হাজার ১৯ মেগাওয়াটের ৩৩টি বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ ভাগ বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে চায়। ২০৩০ সালের মধ্যে সারা দেশে ২৮ হাজার কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন এবং ৬ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার বিতরণ লাইন নির্মাণ করবে।  তিনি জানান, ছয় দেশে এখন দৈনিক ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে। গ্যাসের চাহিদার বাকিটা এলএনজি আমদানি করে মেটানো হচ্ছে। দেশে দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। সরকার প্রতিদিন ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানির জন্য একটি স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ক্ষমতা বাড়িয়েছে। ২০০৯ সালে দেশের জ্বালানি তেলের মজুতক্ষমতা ছিল ৮ দশমিক ৯৩ লাখ মেট্রিক টন। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৩ দশমিক ২০ লাখ মেট্রিক টন।