বাবুলের সোর্স মুসাকে গুম করল কারা?

চট্টগ্রামে মাহমুদা খানম মিতু হত্যার পাঁচ বছর পরও তার স্বামী সাবেক এসপি বাবুল আক্তারের প্রধান সোর্স কামরুল ইসলাম সিকদার ওরফে মুসার কোনো সন্ধান পায়নি তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মুসাকে গুম করার পেছনে কারা জড়িত, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য মিলছে না। মুসার স্ত্রী পান্না আক্তার দাবি করেছেন,  মিতু হত্যার ১৭ দিন পর ডিবি পুলিশ পরিচয়ে কিছু লোক তার স্বামীকে নগরীর কাঠগড় এলাকা থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। মুসাকে গ্রেফতারের সময় সাদা পোশাকধারী সিএমপির দুই জন ওসিকে চিনতে পেরেছেন বলেও পান্না দাবি করেন। ঐ দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত করতে পারবেন যে তার স্বামী মুসা কোথায় আছে। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মুসাকে খুঁজে পাওয়া গেলেই মিতু হত্যার সব রহস্যের জট খুলে যাবে। কিন্তু বাবুল আক্তারের বিশ্বস্ত ঐ দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে রহস্যজনক কারণে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না। তারা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ও পিবিআইতে বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে নগরীর ওআর নিজাম রোড আবাসিক এলাকার প্রবেশ মুখে নিজের আট বছর বয়সি ছেলের সামনে দুর্বৃত্তদের গুলি ও ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন মিতু। হত্যাকাণ্ডের পর তার স্বামী তত্কালীন পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তখন পুলিশের ধারণা ছিল চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ড জঙ্গিরা ঘটিয়ে থাকতে পারে। পরে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে এই হত্যার সঙ্গে বাবুল আক্তারের প্রধান সোর্স মুসাসহ সাত জন সরাসরি জড়িত।

ঐ বছরের ২৪ জুন বাবুল আক্তারকে ঢাকায় ডিবি অফিসে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এর কয়েক দিন পর পুলিশের চাকরি থেকে বাবুল ইস্তফা দেওয়ার পর ঢাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে যোগদান করেন। এরপর ৫ জুলাই চট্টগ্রামে মিতু হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দুই জন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। এ ব্যাপারে মিতুর বাবা মোশারফ হোসেন গতকাল বলেন, ‘ঘটনার সময় বাবুল আক্তার খিলগাঁওয়ে তার বাড়িতে ছিলেন। ঐ সময় মোবাইল ফোনে বাবুল আক্তার চট্টগ্রামের এক থানার ওসিকে ফোন দিয়ে বলেন, মিতু হত্যার সঙ্গে যেই জড়িত থাক, তাকে মাইনাস করে দাও।’ বাবুল আক্তার যে এই খুনের সঙ্গে জড়িত—এটা জানার পরও কেন প্রতিবাদ করেননি জানতে চাইলে মোশারফ হোসেন বলেন, ‘আমরা তখন বুঝতেই পারিনি যে বাবুল আক্তার এতটা দুর্ধর্ষ। সে হত্যার পরিকল্পনা করে উলটো শ্বশুরবাড়িতে বসেছিল। পরে যখন বুঝতে পারি যে বাবুল আক্তারই মূল খুনি, তখন আমরা পুলিশকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছর পর সেই বিষয়টি আমলে নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে।’

দুই পুলিশ কর্মকর্তা কোথায়? : মিতু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কুশীলব কামরুল ইসলাম শিকদার মুসার অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ বলছে মুসা পলাতক। তবে মুসার স্ত্রী পান্না আক্তারের দাবি—২০১৬ সালের ২২ জুন ডিবির পরিদর্শক মহিউদ্দিন সেলিম ও নিজাম উদ্দিন তার স্বামীকে আটক করে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিদর্শক মহিউদ্দিন সেলিম বর্তমানে চট্টগ্রাম পিবিআইতে কর্মরত। আর পরিদর্শক নিজাম উদ্দিন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার ওসির দায়িত্ব পালন করছেন। যদিও পুলিশ মুসা গুমের সঙ্গে এই দুই পুলিশ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বারবার অস্বীকার করে আসছে।

যেভাবে হত্যাকাণ্ড : ২০১৬ সালের ২৪ জুন বাবুল আক্তারের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ঐ বছরের ২৬ জুন আনোয়ার ও মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম নামে দুই জনকে গ্রেফতারের তথ্য জানায় পুুলিশ। তারা আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলে, কামরুল ইসলাম সিকদার ওরফে মুসার ‘পরিকল্পনাতেই’ এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। জবানবন্দিতে ওয়াসিম জানায়, নবী, কালু, মুসা ও তিনি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়। পরে এ ঘটনায় সন্দেহভাজন দুই আসামি নূরুন্নবী ও রাশেদ পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। মুসাসহ দুই জন গুম হয়ে যায়। এই মামলায় বর্তমানে ওয়াসিম ও আনোয়ার গ্রেফতার হয়ে কারাবন্দি। নবী, কালুসহ তিন জন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

বাবুলের শ্বশুরের মামলা: দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর তদন্তের পর গত ১২ মে বাবুলের দায়ের করা মিতু হত্যা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন চট্টগ্রামের আদালতে দাখিল করেছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রতিবেদনে মিতু হত্যায় বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বিষয়টি অবহিত হয়ে একইদিন বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে নতুন একটি হত্যা মামলা করেন মিতুর পিতা মোশারফ হোসেন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তা গায়ত্রী অমর সিংয়ের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বাবুল আক্তার। বিষয়টি জানার পর মেনে নিতে পারেননি মিতু। এর জের ধরে বাবুল ও মিতুর দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময় মিতুকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন বাবুল। এরই ধারাবাহিকতায় মুসাসহ কয়েক জন বাবুল আক্তারের নির্দেশে মিতুকে হত্যা করে। মিতুর বাবার মামলায় পুলিশ সেদিনই বাবুলকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। এরপর তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গত সপ্তাহে তাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফেনী জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে।

এদিকে বাবুল আক্তারের কথিত বান্ধবী গায়ত্রী অমর সিং বর্তমানে ইউরোপের একটি দেশে জাতিসংঘের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউএনএইচসিআরে কর্মরত। তার অবস্থান জানতে চেয়ে এবং মামলার প্রয়োজনে তার সঙ্গে কথা বলার অনুমতি চেয়ে গত সপ্তাহে ইউএনএইচসিআরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পিবিআই চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ সুপার নাইমা সুলতানা।