চট্টগ্রামে সাড়ে ৬ হাজার নলকূপ অকেজো, সুপেয় পানির সংকট

শিল্পকারখানা, খাবার ও কৃষিকাজে যত্রতত্র গভীর নলকূপ বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে প্রতি বছর চার-পাঁচ ফুট করে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় সাড়ে ৬ হাজার নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। 

ফলে দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির সংকট। এর মধ্যে সরকারি ভাবেও প্রতি বছর প্রচুর গভীর নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যত্রতত্র নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশ না করায় পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। ফলে এখনই বিকল্প ব্যবস্থায় ভূ-উপরস্থ পানির ব্যবহার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।

চট্টগ্রামের পটিয়া, কর্ণফুলী, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, লোহাগাড়া, আনোয়ারাসহ আরো কয়েকটি এলাকায় সুপেয় পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় ইতিমধ্যে প্রচুর ছোটবড় শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। কারখানাগুলোতে ভূ-উপরস্থ পানি ব্যবহারের কোনো ব্যবস্থা নেই। শিল্পকারখানায় উত্পাদন কাজে ব্যবহারের জন্য একাধিক গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে শিল্পকারখানার আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে বাড়িঘরে সুপেয় পানির জন্য স্থাপিত কম গভীরতার নলকূপগুলো অকেজো হয়ে পড়ছে। মিরসরাই শিল্পকারখানার কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নলকূপে পানি পাচ্ছে না এলাকাবাসী। ফলে গতকাল এলাকাবাসী সুপেয় পানির জন্য বিক্ষোভ সমাবেশ করে। মিরসরাই উপজেলায় হিংগুলি, জোরারগঞ্জ, দুর্গাপুর এলাকায় সুপেয় পানির চারম সংকট বিরাজ করছে। নলকূপ বসিয়ে পানি মিলছে না। 

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী কে এম সাইদ মাহমুদ বলেন, প্রতি বছর তিন-চার ফুট করে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। আগে যেখানে ২০ ফুট নিচে গিয়ে পানি পাওয়া যেত এখন ৩৫/৪০ ফুট নিচে যেতে হচ্ছে। উপজেলায় ২৫ শতাংশ নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। পটিয়া উপজেলায় ৫৭৭টি নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। চরকানাই, হুলাইন,পাচুরিয়া হাবিলাসদ্বীপ এলাকায় অধিকাংশ নলকূপ অকেজো। এতে কয়েক হাজার মানুষ সুপেয় পানি সংকটে পড়েছে। আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর, দক্ষিণ গহিরা, পূর্বগহিরা, সরেঙ্গা, উত্তর পরুয়াপাড়া সুপেয় পানির চরম সংকট বিরাজ করছে। উপজেলায় ৪৯৯টি নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে।

এদিকে এ অবস্থার মধ্যেও সরকারিভাবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার গভীর নলকূপ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন রায় ইত্তেফাককে বলেন, খাবারের জন্য খুবই কম পরিমাণ পানির ব্যবহার হয়। ফলে সরকারি এসব নলকূপে ভূগর্ভস্থ পানির খুব একটা ক্ষতি হচ্ছে না। তবে কৃষি ও শিল্পকারখানায় ভূগর্ভস্থ পানির বেশি ব্যবহার হচ্ছে। তার প্রভাব পড়ছে পানির স্তরে। সরকার প্রকল্পের মাধ্যমে পানি পরিশোধন করে উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। চট্টগ্রামে তিনটি উপজেলায় এর কার্যক্রম চলছে। প্রকল্পের জন্য পানির উত্স হিসেবে নদী-খালের পানি ব্যবহার করা হবে।

চুয়েটের সাবেক ভিসি ও চট্টগ্রাম ওয়াসা পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. জাহাঙ্গীর আলম ইত্তেফাককে বলেন, শহরে-গ্রামে পাকা দালান নির্মাণের কারণে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরাসরি নদী-খালে চলে যাচ্ছে। আমাদের ভূ-উপরস্থ পানির ব্যবহার নিয়ে ভাবতে হবে। কক্সবাজারে ইনানী বিচের পানি অত্যন্ত স্বচ্ছ। সেখান থেকে পানি উত্তোলন করে পরিশোধন করলে পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামে সরবরাহ করা যাবে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জানায়, চট্টগ্রামে বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও সন্দ্বীপ এলাকায় প্রকল্পের মাধ্যমে শোধনাগার নির্মাণ করে পরিশোধনের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বাঁশখালী সদর এলাকার উত্তর জলদী এলাকায় তিনটি নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে নির্মিত শোধনাগারে পরিশোধন করা হবে। এসব পানি শোধনাগারের পাশে নির্মিত ওভারহেড ট্যাংকে রাখা হবে। ট্যাংকগুলোর পানির ধারণক্ষমতা ৬ লাখ লিটার। সেখান থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরবরাহ দেওয়া হবে। অন্যদিকে চন্দনাইশে নির্মিত প্রকল্পে সাঙ্গু নদ থেকে পানি সংগ্রহ করে পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহ দেওয়া হবে। সন্দ্বীপে নির্মিত প্রকল্প থেকে ইতিমধ্যে পানির সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপে মিরসরাই ও সাতকানিয়া উপজেলার জন্য পানি শোধনাগার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

 

ইত্তেফাক/ইউবি