শখের তোলা আশি টাকা

জীবনে ভালো থাকা ও বেঁচে থাকার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ করার পাশাপাশি বিভিন্ন শখের কাজ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শখের কাজ করার মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সঙ্গে নিজে নিজে মোকাবিলা করতে শেখে এবং নিজের ও জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করে। অস্ট্রেলিয়ান সাইকোলজিক্যাল সোসাইটির প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, গবেষণায় অংশগ্রহণকারী পাঁচ জনের মধ্যে চার জনই পছন্দের গান শোনা বা পছন্দের কোনো কাজ করার মাধ্যমে তাদের মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করেন। বিনোদনমূলক, বহিরাঙ্গন সম্পর্কিত বা দলীয় কার্যকলাপ যেমন—কোনো দলীয় খেলাধুলা, ভ্রমণ বা হাইকিং ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে আনন্দলাভের পাশাপাশি সামাজিকতা ও যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ থাকে। তবে অবশ্যই এ বিষয়গুলো নির্ভর করে ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর।

শখের বিষয়বস্তু বিভিন্ন রকম হতে পারে। ঘরে বা বাইরে, বিভিন্নভাবে শখের কাজ করা যায়। গান শোনা, সংগীতচর্চা করা, কবিতা বা গল্প-উপন্যাস পড়া ও লেখা, দেশবিদেশের খাবার রান্না করা ও খাওয়া, ফ্যাশন ডিজাইনিং বা মেকাপ আর্ট করা, অরিগ্যামি বানানো, বাগান করা, পর্বত আরোহণ করা, ভ্রমণ করা, নাচ করা, চিত্রাঙ্কন করা, ডিজিটাল মিডিয়ায় সৃজনশীল কিছু তৈরি করা, শরীর চর্চা করা, খেলাধুলা করা ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের কাজ শখের বিষয়বস্তু হতে পারে। আধুনিক যুগে ডিজিটাল মিডিয়া মানুষের কাছে শখের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এক দশক আগেও কমিক্স তৈরি করা বা দেশবিদেশের খাবার নিয়ে পরীক্ষা ও অনুসন্ধান করাটা যে শখের বিষয় হতে পারে, তা অনেকেই মানতে চাইত না। মনে রাখা দরকার, যে কোনো কাজ, যা মানসিক উন্নয়ন সাধন করে এবং জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত করে সেটাই শখের কাজ। অবশ্য এক্ষেত্রে একটি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখা প্রয়োজন যে, শখের কাজ যাই হোক না কেন, তা যেন কারো জন্য ক্ষতিকর না হয় এবং ব্যক্তির বিকাশে তা যেন ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যক্তি যদি তার প্রয়োজনীয় কাজগুলোকে অগ্রাহ্য করে শখের কাজ নিয়েই পড়ে থাকে এবং এতে যদি তার কোনোরূপ উন্নতি সাধিত না হয়, তাহলে সে শখের কাজের উপযোগিতা নিয়ে তার ভেবে দেখা উচিত। সুতরাং, শখের কাজ হওয়া উচিত ব্যক্তির মনন ও সৃজনে হিতকর।

শৈশব থেকেই মানুষ শখের বিষয়বস্তু নির্বাচন করে নেয়। অনেকেরই শখের বিষয় বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পালটে যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে, বড়দের উচিত ছোটদের সাহায্য করা এবং তাদের কথা ভেবেচিন্তে তাদের শখের কাজে বাধা না দেওয়া। ধরা যাক, কোনো বাচ্চা নাচ শিখতে আগ্রহী কিন্তু তার বাবা-মা চান তাকে গান শেখাতে। হুট করেই বাচ্চার ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে এক্ষেত্রে বাব-মার উচিত প্রথমে তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা। এরপর উভয়পক্ষ মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া। বয়সে যত ছোটই হোক না কেন, প্রতিটি মানুষের নিজের মতামত এবং পছন্দের কাজ থাকে, যা করে সে স্বস্তি ও আনন্দবোধ করা। এসব ক্ষেত্রে বাচ্চাদের সঙ্গে রুক্ষ ব্যবহার বা মিথ্যে আশ্বাস দেওয়া একদমই উচিত নয়, কারণ সেক্ষেত্রে বাচ্চাটি একটি অবিশ্বাসপূর্ণ মনোভাব নিয়ে বড় হয় এবং এর ফলে পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্বাভাবিক নাও হতে পারে। শান্তভাবে আলোচনা এবং দৃঢ়তা ও বিশ্বাসের সঙ্গে তার হাত ধরে তাকে পরিচালনা করলে বাচ্চাটি একটি সহজ, স্বাভাবিক ধারণা, সম্মান এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে বড় হতে পারে। শখকে গুরুত্ব দিয়ে সঠিকভাবে পরিচালনা করলে তা ব্যক্তির একটি গুণে রূপান্তরিত হতে পারে। জীবনে ভালো থাকতে হলে যেমন আনন্দের প্রয়োজন, তেমনি আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ় মননেরও প্রয়োজন। সেজন্য শখের কাজ যেমনি হোক, তা নির্বাচনে ও পরিচালনায় যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদান করা উচিত। সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের মানুষেরও উচিত একটি সহজ, স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটি ব্যক্তির পছন্দ অপছন্দকে বোঝার চেষ্টা করা। এক্ষেত্রে ভেবেচিন্তে অগ্রসর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই, কারণ কোনো কাজ আগ্রহ নিয়ে করা হলে সে কাজে সফলতার হার স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি থাকে, যা মানুষের মানসিকতারই একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। আর এজন্যই লোকমুখে বলা হয়, শখের তোলা আশি টাকা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়