যে দেশের তরুণশক্তি যত বেশি কর্মশক্তিপূর্ণ সেই দেশ তত উন্নত। একটি আধুনিক দেশ নির্মাণে তারুণ্যের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এদেশের মেধাবী ও সৃষ্টিশীল তারুণ্য প্রচারণার ডামাডোল থেকে দূরে থেকে নানা বিষয়ে বিস্ময়কর অবদান রেখে চলেছে। আমরা প্রায়শই হতাশ হই তারুণ্যের দানব রূপ দেখে—নীতিহীন রাজনীতিতে, সন্ত্রাসে, বিবেকহীন লেজুড়বৃত্তিতে, নিয়ন্ত্রণহীন চাঁদাবাজিতে, মেধাহীন প্রকাশে আর দিশাহীন অনিশ্চিত ভবিষ্যতে; কিন্তু আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় তারুণ্যের ‘মাতৃ’ রূপ—যখন তা মানবিক সৃষ্টিশীল রশ্মি ছড়ায়—সাধারণের কল্যাণে, সমাজের উন্নয়নে বা দেশ বিনির্মাণে।
এ কথা বলা অন্যায় হবে না, বর্তমানে বিভিন্ন মানবিক, সেবামূলক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়াস, যেগুলো খুব দরকারি কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যেখানে অপ্রতুল সেখানে সৃষ্টিশীল তারুণ্য তাদের মেধা ও আধুনিক কলাকৌশল নিয়ে এগিয়ে এসেছে। রক্ত সরবরাহের ব্যবস্থার কথাটাই ধরা যাক—এখন এর একটি ভালো উত্স হচ্ছে বিভিন্ন তারুণ গোষ্ঠী বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত ‘ব্লাড ব্যাংক’। এই ব্লাড ব্যাংক মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-নির্ভর সদস্যের এক একটি তথ্যভান্ডার যেগুলোকে ব্যবহার করে খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। রক্তদাতারা প্রায় সবাই তরুণ, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এই উদ্যোগ।
রাজধানী ঢাকাসহ নানা শহরে বসবাসকারী স্বল্প আয়ের পরিবারের শিশুদের মধ্যে শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন তরুণ সংগঠনের অবদান চোখে পড়ার মতো। রাষ্ট্র যেখানে এগিয়ে যেতে পারেনি, সেখানে তরুণরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাদের সীমিত সামর্থ্য অথচ অসামান্য মনোবল নিয়ে। তারুণ্য এখানে সৃষ্টিশীল। তারা ব্যবহার করেছে উন্নত প্রযুক্তি, সমন্বয় করছে নানা ধারণার, খুঁজে বের করছে অর্থ যোগানের নানা কৌশল। এভাবেই তরুণেরা শতভাগ শিক্ষা অর্জন নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
একই রকম প্রয়াস চলছে দেশের আনাচকানাচ, দুর্গম পাহাড়ে, সুবিধাবঞ্চিত জনপদে, অবহেলিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীতে। তারুণ্য তার মানবিক মাতৃরূপের বর্ণচ্ছটায় আলোকিত করছে, দূর করছে অন্ধকার। অনেক তরুণ প্রতিষ্ঠা করছে স্কুল, দাতব্য প্রতিষ্ঠান—ব্যক্তিগত বা দলীয় উদ্যোগে।
নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এদেশের তারুণ্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে দ্বিধাহীনভাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দুর্গম এলাকার বিশেষ প্রয়োজন সম্পর্কে দ্রুত তথ্য সরবরাহ হচ্ছে আর তার প্রতিক্রিয়ায় দ্রুত সাড়া দিচ্ছে তরুণসমাজ। তারা পৌঁছাতে পারছে স্বল্প সময়ে, স্বল্প খরচে, যথাযথ সাহায্য নিয়ে। ফলে তারা চলমান ব্যবস্থার একটা ভালো বিকল্প হয়ে উঠছে যেখানে সাধারণ জনগণের আস্থার জায়গাটা অনেক বেশি শক্তিশালী। তরুণরা সেখানেও নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে থাকে।
এই পথ ধরেই এখন দেশের নানা স্থানে ঘটে যাওয়া অনাচারের তথ্য উঠে আসছে যোগাযোগমাধ্যমে, প্রচার পাচ্ছে মিডিয়াতে, ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিকার পাবার পথ সুগম হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখছে তরুণ সমাজ। বাংলাদেশের সংগীত জগত্—বিশেষ করে আধুনিক সংগীত মূলত বিশ্বের সঙ্গে এগিয়ে চলছে কিছু তরুণের অপরিসীম প্রচেষ্টার ফলে। একই কথা প্রযোজ্য ‘ফটোগ্রাফি’-এর ক্ষেত্রে। অনেক রাষ্ট্রীয় সম্মান এসেছে এই তরুণদের হাত ধরে। দেশে অনেক মেধাবী তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাণে দেখিয়েছে দক্ষতা। তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার, সম্প্রসারণ, রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে তরুণদের ভূমিকা প্রশংসনীয়।
বর্তমানে তরুণ সমাজই দেশের উদ্ভাবনের, মানবিক স্পন্দনের ও সামাজিক সমস্যা সমধানের এক বিরাট শক্তি। নেতৃত্ব যেখানে ক্ষমতালিপ্সু, রাজনীতি যেখানে পথভ্রষ্ট, তারুণ্য সেখানে আশাভরসার স্থল। সুস্থ, সবল, নির্ভীক, সত্, নিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, স্বপ্নচারী তারুণ্যের জয় হোক। একজন নিষ্ঠাবান তরুণ চাইলেই বদলে দিতে পারে সমাজ, বদলে দিতে পারে দেশ।
n লেখক : শিক্ষার্থী, বলদিয়া বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়, ভূরুঙ্গামারী, কুড়িগ্রাম