গত দুই বছরে ইসরায়েলে চার বার পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে একটানা ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহুও শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সরকার গঠিত হয়েছে মধ্যপন্থি জায়ের ল্যাপিডের নেতৃত্বে। তবে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন কট্টর ডানপন্থি হিসেবে পরিচিত নাফতালি বেনেত। নতুন ঐকমত্যের সরকার গঠনের মাধ্যমে নেতানিয়াহুর একসময়ের শিষ্য বেনেটের ভাগ্য খুললেও ইসরায়েলের হাতে নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যের বদল ঘটেনি। তবে রাজনীতিক বেনেট সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে কতটা তার ব্যক্তিগত জীবনকে কাজে লাগাবেন, তা দেখার অপেক্ষায় বিশ্ববাসী।
বেনেতের ভাগ্য ফিরল যেভাবে
নেতানিয়াহুর সাবেক শিষ্য বেনেত। আমেরিকান অভিবাসী পিতার সন্তান বেনেট আট বছর আগে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। একটি ছোট দলের নেতা। আন্তর্জাতিকভাবে কেউ তাকে ভালো করে চিনতেনও না। তাকে চরম ডানপন্থি, বাস্তববাদী ও সুবিধাবাদী হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়। একসময়ের গুরু নেতানিয়াহুকে সরিয়ে ক্ষমতার মুকুটটি যাচ্ছে তার মাথায়। বেনেত হয়তো কোনো দিন কল্পনাও করেননি যে তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন। কারণ তার ইয়ামেনি দলটি খুবই ছোট। ইসরায়েলি পার্লামেন্টে ১২০টি আসন। সরকার গঠনে দরকার ৬১টি। কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। সবচেয়ে বেশি পেয়েছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি (৩০টি)। এরপর জায়ের ল্যাপিডের যিশ আতিদ পার্টি ১৭টি, আরেহ ডেরির শাস পার্টি ৯টি, বেনি গনতেজের ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পার্টি আটটি এবং নাফতালি বেনেতের ইয়ামেনি পার্টি সাতটি আসন পেয়েছে। আরও তিনটি দল সাতটি করে আসন পেয়েছে। চারটি পার্টি ছয়টি করে এবং একটি চারটি আসন পেয়েছে। বেশি আসন পেয়েও কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারছেন না। কম আসন পেয়েই রাজনৈতিক কৌশলে দরকষাকষি করে প্রধানমন্ত্রীর পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন বেনেত। বিরোধী জোটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা ল্যাপিড। মধ্যপন্থি এই নেতা এত দিন বিরোধী দলনেতা ছিলেন। তার নেতৃত্বেই একাধিক বিরোধী দল নিয়ে নতুন জোট। এই জোটে বাম, ডান ও মধ্যপন্থি দলগুলো থাকছে। তাদের মধ্যে একটাই মিল, তারা সবাই নেতানিয়াহুর শাসনের অবসান চান।
বেনেটকে নিয়ে শঙ্কা যে কারণে
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বিজয় অর্জন করেন, তখন ইসরায়েলের বসতি স্থাপনের পক্ষের ছোট্ট একটি দলের নেতা নাফতালি বেনেত জেরুজালেমে বসে বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র পাওয়ার যুগ শেষ। ৪৯ বছর বয়সি বেনেট পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি বাড়ানোর পক্ষে এবং তিনি কখনো একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র চান না। সাম্প্রতিক সংঘাতের বেশির ভাগ দায় ফিলিস্তিনিদের বলে গত বৃহস্পতিবার মন্তব্য করেন বেনেত। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) প্রতিনিধি বাসেম আল-সালহির মতে, বেনেট নেতানিয়াহুর চেয়ে কম চরমপন্থি নন। তিনি কতটা চরমপন্থি, তা প্রমাণের চেষ্টা চালাবেন। গাজার সরকারি কর্মকর্তা আহমেদ রেজিকের কণ্ঠেও একই সুর। ইসরায়েলের নেতারা তাদের দেশের জন্য ভালো কিংবা খারাপ। কিন্তু আমাদের প্রশ্নে তারা সবাই খারাপ এবং তারা সবাই ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও ভূমি ফিরিয়ে দিতে চান না।
বেনেতকে নিয়ে আশাও আছে
চার সন্তানের জনক বেনেটই প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি কিপা (ইহুদিদের একরনের টুপি) পরবেন। তবে তিনিই এমন একটি ঐকমত্যের সরকারের নেতৃত্ব দেবেন, যেটি দেশটিতে প্রথমবারের মতো সর্বাপেক্ষা ধর্মনিরপেক্ষ। তার সরকারে মধ্যপন্থি, বামপন্থি ও ডানপন্থি সবাই আছে। এমনকি ছোট্ট আরব ইসলামিক পার্টির সমর্থনও তার লাগবে। জোট সরকার ইসরাইল-ফিলিস্তিন সম্পর্কের চেয়েও দেশীয় ইস্যুকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বেনেটকে এখন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হবে। আর ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। কারণ ট্রাম্পের চেয়েও বাইডেন নেতানিয়াহুর প্রতি একটু হলেও বেশি দুর্বল।
ইসরায়েলে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন সমঝোতার বিশেষ মার্কিন দূত মার্টিন এস ইনডিক বলেন, বসতি স্থাপনকারীরা তাদের অধিকার রক্ষা করতে বেনেতের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে। কিন্তু বেনেত ইতিমধ্যে অঙ্গীকার করেছেন যে, তিনি ঐ ইস্যু নিয়ে অগ্রসর হবেন না।
নেতানিয়াহু বেনেতকে ‘শতাব্দীর সেরা প্রতারক’ বলে উল্লেখ করেছেন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে বেনেত প্রথমবারের মতো দলের প্রচারণায় নামেন। তখন তার দলকে লিকুদ পার্টি ভয়ানক ডানপন্থি বলে প্রচারণা চালিয়েছিল। কিন্তু সেই লিকুদ পার্টিই এখন বেনেটকে ভয়ানক বামপন্থি বলে উল্লেখ করেছে। তবে তাকে যারা ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন এমন মানুষেরা বলছেন, বেনেত বাইরে যা দেখান, ভেতরে ততটা নন। তিনি বাস্তববাদী মানুষ। তবে সেই মানুষটি সরকার কীভাবে পরিচালনা করবেন তা দেখার বিষয়।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আয়েলেত ফ্রিশ বলছেন, মানুষ মনে করে যে বেনেট ধর্মান্ধ। কিন্তু বেনেত একসময় তাকে বলেছিলেন যে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির মধ্যেই বড় হয়েছেন। আর বিশ্বের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা মানুষগুলোও ধর্মনিরপেক্ষ। তাদের সঙ্গেই তিনি কাজ করেছেন।
বেনেত ইসরায়েলে জন্মগ্রহণ করেছেন। তবে তার শৈশবের একটা অংশ কেটেছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়। তিনি ইসরায়েলের আর্মি কমান্ডো ইউনিটেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর তিনি নিউ ইয়র্কে যান এবং একটি সফটওয়্যার কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। সেটি ১৪৫ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করে দেন এবং অন্য কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। নেতানিয়াহুর পর তিনিই হবেন ইসরায়েলের দ্বিতীয় অল্প বয়সি প্রধানমন্ত্রী।
ইত্তেফাক/টিআর