বিশ্বরঙ’র আয়োজনে ‘সেরা জামাই যুদ্ধ’

  শাহিনুর আলম কলি

 

মধুমাসে জামাইষষ্ঠী বাংলার লোক-সংস্কৃতির একটা অংশ। এই উত্সবটি আদিকাল থেকে বাঙালি সমাজের ঘরে ঘরে লোকাচার হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। জ্যৈষ্ঠ মাসে শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে বাঙালি মায়েরা সন্তানের মঙ্গল কামনায় বিশেষ করে শাশুড়ি মায়েরা ষষ্ঠী ব্রত কামনা করে। সাধারণত সন্তানের মঙ্গল কামনার্থে মায়েরা এই পূজা করে থাকেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে সন্তান প্রাপ্তির আশাতেও এই পূজো করা হয়। ষষ্ঠীর পূজো সাধারণত মহিলারাই করে থাকেন।

এক সময়ে সংস্কার ছিল, ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মেয়ের বিয়ের পর তার বাবা বা মা মেয়ের বাড়িতে ততদিন পর্যন্ত যেতে পারবেন না, যতদিন না মেয়ে সন্তানসম্ভবা হন বা সন্তানের জন্ম দেন। এখনকার যুগে নিয়ম হয়েছে— যিনি কন্যা দান করবেন, তিনি এক বছর মেয়ের বাড়িতে কিছু খেতে পারবেন না। সে ক্ষেত্রে বিবাহিত কন্যার মুখদর্শন কীভাবে ঘটবে? তাই সমাজ বেছে নিল এই পথ। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ষষ্ঠীর দিনটিকে বেছে নেওয়া হল জামাইষষ্ঠী হিসেবে। যেখানে মেয়ে জামাইকে নিমন্ত্রণ করা হবে এবং তাদের সমাদর করা হবে। সঙ্গে মা ষষ্ঠীর পূজো করা হবে যাতে মেয়ে-জামাই শীঘ্রই সন্তানের মুখ দেখতে পান। জামাই ষষ্ঠীর দিন জামাইয়ের হাতে হলুদ মাখানো সুতো বেঁধে দেওয়া হয় মা ষষ্ঠীর আশীর্বাদ হিসেবে। আর এতে করে মেয়ের মুখ দেখা সম্ভব হলো। তাই এই উত্সবের নামকরণ করা হয়েছে জামাইষষ্ঠী।

বহু জামাই আছেন এমন দিনে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে হাতে মিষ্টির ঝোলা ও বিশাল মাছ হাতে শ্বশুরবাড়িতে হাজির হতে পছন্দ করেন। বাঙালি সমাজে প্রচলিত প্রবাদ আছে ‘যম-জামাই-ভাগনা— কেউ নয় আপনা। কিন্তু, নতুন পাখার উপর আমের পল্লব এবং আম ও তত্সহযোগে পাঁচ ধরনের ফল সাজিয়ে জামাইয়ের মঙ্গল কামনায় শাশুড়ির দল জামাইষষ্ঠীর দিনে ব্রত রক্ষায় ব্রতী হন। এখানেই শেষ নয়, ১০৮টি দুর্বাবাঁধা আঁটি দিয়ে পূজার উপকরণ সাজাতে হয়। করমচাসহ পাঁচ থেকে সাত বা নয় রকমের ফল কেটে কাঁঠাল পাতার উপর সাজিয়ে রাখতে হয় শাশুড়িকে।

যে জামাই কখনও আপন হয় না বলে প্রবাদ, তাহলে তার জন্য এত ঘটা করে জামাই ষষ্ঠী পালন করার কী দরকার? কী দরকার পূজার শেষে জামাইকে পাখা হাওয়া আর শান্তি জলের ছিটা দেওয়া! এমনকি, মা ষষ্ঠীর আশীর্বাদ বলে জামাইয়ের হাতে হলুদ মাখানো সুতো পরিয়ে দেওয়া! এসবই বা কেন?

এই সবকিছুরই পিছনে রয়েছে গভীর স্বার্থ। আর এই স্বার্থটা হলো জামাইকে তোষামোদ। কারণ, এতে মেয়ে ভালো থাকবে। যম মানুষের মৃত্যু দূত। ভাগনা অন্যের বাড়ির ছেলে। কিন্তু, জামাই অন্যের বাড়ির হলেও মেয়ের সঙ্গে সাংসারিক বন্ধন থাকায় শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কে আবদ্ধ। তাই যম, ভাগনা ছেড়ে জামাইকে আপ্যায়নের মানে মেয়েকে ভালো রাখা। তাই হাজারো লোকাচার। হাজারো বিধি পালনের হিড়িক।

জামাইয়ের মঙ্গলার্থে ধানের ব্যবহারও হয়। কারণ, ধান সমৃদ্ধির ও বহু সন্তানের প্রতীক। দুর্বা ব্যবহূত হয় চির সবুজ ও চির সতেজের প্রতীক হিসাবে। এর মানে জামাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা। এখানেই শেষ নয় জামাইকে আশীর্বাদ করে ষাট-ষাট বলাটাও শাশুড়িদের নিয়মের মধ্যে পড়ে। মনে রাখবেন, এর সমস্তটাই হচ্ছে শুধু জামাইয়ের জন্য। আসলে মেয়ের জন্য মঙ্গলচিন্তা এবং তার সংসার অঁটুট রাখার প্রার্থনাতেই এত আয়োজন হয়।

এই তো কয়েক দশক আগেও জামাইষষ্ঠীর সপ্তাহখানেক আগে থেকেই সাজ সাজ রব পড়ে যেত। কাঁসার বা রুপোর থালার চারপাশে সাজানো পঞ্চব্যাঞ্জন। যত্নে বোনা নরম আসনে জামাই বাবাজি বসে আয়েস করে রসাস্বাদন করতেন পঞ্চব্যাঞ্জনের। জামাইষষ্ঠী মানেই জামাইয়ের রীতিমত খাতিরদারি যাকে বলে। বছরের এই সময়টা জামাইকে এই সংস্কারের মাধ্যমে শাশুড়িদের তোয়াজ করতে হয়। জামাইয়ের মঙ্গল কামনার সঙ্গে সঙ্গে তাকে পেট পুরে খাওয়ানোটাও এই সংস্কারের মধ্যে পড়ে। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে একবার নজর বুলিয়ে নিন এই বিশাল ভুরিভোজের পদগুলিতে। সকাল থেকে রাত, জামাইয়ের পাত জুড়ে থাকা চাই চাঁদের হাট। কমতি রাখা চলবে না কিছুতেই। বাঙালির পেট পুরে ভুরিভোজের অন্যতম উত্সব এই জামাইষষ্ঠী। তাই রসনায় রাখতেই হবে রাজকীয় ব্যবস্থা। মাছ, মিষ্টি, চাওয়া মাত্রই পাতে হাজির করতে হবে তত্ক্ষণাত্।

ঢাকা বা চট্টগ্রামে আবার বিয়ে পাকা হলে মেয়ে ও ছেলের বাড়ি একে অপরকে জ্যৈষ্ঠ মাসে আম-দুধ খাওয়ানোর প্রথা আছে। মূলকথা, মেয়ে যাতে সুখে শান্তিতে দাম্পত্য জীবন কাটাতে পারে তাই জ্যৈষ্ঠ মাসে নতুন জামাইকে আদর করে বাড়িতে এনে আম-দুধ খাইয়ে আশীর্বাদ হিসাবে উপহার দেওয়া।

অরণ্যষষ্ঠী সম্পর্কে বলা হয়— জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠীতে মহিলারা একহাতে পাখা নিয়ে বনে বিচরণ করেন, বিন্দ্যবাসিনী ষষ্ঠী দেবীকে পূজা করেন, কন্দ ফলমূল আহার করেন এবং পরিণামে শুভ সন্তানতি লাভ করেন। এখন আর বনে পূজার প্রচলন নেই, বাড়ির মধ্যে বটের ডাল পুতে তার তলায় পিটুলি, হলুদবাটা ও ভুষো কালি দিয়ে ষষ্ঠী দেবী, তার বাচ্চাকাচ্চা ও বাহন বিড়ালের মূর্তি তৈরি করে পূজা করা হয়। পূজা শেষে ব্রতকারিণীরা বটপাতার উপরে রাখা ষষ্ঠীদেবীর সন্তান-সন্ততির মূর্তিগুলো হাতে নিয়ে ব্রতকথা শুনতেন।

কথিত রয়েছে একবার এক গৃহবধূ স্বামীর ঘরে নিজে মাছ চুরি করে খেয়ে দোষ দিয়েছিলেন বিড়ালের ওপর। বিড়াল হচ্ছে ষষ্ঠীদেবীর বাহন। ফলে তার সন্তান হারিয়ে যায়। তার পাপের ফলেই এই ঘটনা ঘটে বলে মনে করা হয়। পরবর্তীকালে ষষ্ঠীদেবীর আরাধনা করে দেবীকে তুষ্ট করেন এবং সন্তান ফিরে পান। এই জন্যই ষষ্ঠীদেবীর অপর নাম অরণ্যষষ্ঠী।

এদিকে মাছ চুরি করে খাওয়ার জন্য শ্বশুর-শাশুড়ি ঐ বধূর পিতৃগৃহে যাওয়া বন্ধ করে দেন। এই অবস্থায় মেয়েকে দেখার জন্য ব্যাকুল মা-বাবা একবার ষষ্ঠীপূজার দিন জামাইকে সাদরে নিমন্ত্রণ জানান। জামাইষষ্ঠী পূজার দিন সস্ত্রীক উপস্থিত হলে আনন্দের বন্যা বয়ে যায় বাড়িতে ষষ্ঠীপূজা রূপান্তরিত হয় জামাইষষ্ঠীতে। 

বাঙালি হিন্দু সমাজে এ উত্সবের সামাজিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বিশেষত যে পরিবারে সদ্য বিবাহিত কন্যা রয়েছে সেই পরিবারে এই পার্বণ ঘটা করে পালন করা হয়। জামাইষষ্ঠী একটি লোকায়ত প্রথা। ষষ্ঠীদেবীর পার্বণ থেকেই এই প্রথার উদ্ভব। বৈদিক যুগ থেকেই জামাইষষ্ঠী পালন হয়ে আসছে। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের ষষ্ঠী তিথিতে প্রথম প্রহরে ষষ্ঠী পূজার আয়োজন করা হয়। শশুরবাড়ি থেকে ষষ্ঠী পূজার দিন জামাইকে সাদরে নিমন্ত্রণ জানানো হয়।

উত্সব পার্বন উদ্যাপনে ফ্যাশন হাউজ ‘বিশ্বরঙ’ ২৬ বছরের ধারাবাহিকতায় জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে পহেলা আষাঢ় প্রথমবারের মতো আয়োজন করেছে ভিন্ন রকম এক প্রতিযোগিতার। যার নামকরণ করা হয়েছে ‘সেরা জামাই যুদ্ধ’। এই ভিন্ন রকম আয়োজনে অংশগ্রহণ করে আপনিও জিতে নিতে পারেন আকর্ষণীয় সব পুরস্কার। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের নিয়ম— ১. মেয়ে জামাইয়ের এক সাথে ০৩ কপি ছবি।  ২. নাম:...।  ৩. ফোন নম্বর:...। ৪. ঠিকানা:...। ছবি পাঠানোর শেষ তারিখ ১০ জুন রাত ১২টা। ছবি পাঠানোর ঠিকানা:br.jamaisosti@gmail.com