‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুর্নীতির ডিপো, অনিয়ম রূপকথার গল্পের মতো’

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট এবং তাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নানা অনিয়মের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন বিএনপি ও জাতীয় পার্টির (জাপা) কয়েক জন সংসদ সদস্য। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তার মন্ত্রণালয়ের ওপর তোপ দাগান তারা। গতকাল সোমবার সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের উপস্থিতিতেই তাকে উদ্দেশ করে এই এমপিরা বলেছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুর্নীতির ডিপো, এখানকার অনিয়ম যেন রূপকথার গল্পের মতো।

বিএনপির এমপি হারুনুর রশীদ বলেন, ‘কেনাকাটায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুর্নীতির ডিপো। কীভাবে এই মন্ত্রণালয়ের সংস্কার করবেন, তা স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সুস্পষ্টভাবে  জানাতে হবে। স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কথা বলতে বলতে তিনি বেহাল হয়ে গেছেন। স্বাস্থ্য বিভাগকে সংস্কারের আওতায় আনতে হবে। বেহাল দশা থেকে রক্ষা করতে কমিটি গঠন করতে হবে। ঢাকায় এক পদে ৫০ জন চিকিত্সক আর জেলা-উপজেলায় চিকিত্সক নেই। লাখ লাখ মানুষ চিকিত্সার জন্য ভারতে যাচ্ছেন। এতে লাখো-কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজাতে পরলে এটা রোধ করা যাবে।’

হারুন বলেন, ‘কবে করোনার টিকা কার্যক্রম শুরু হবে, সেটা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। প্রয়োজনে টিকা আনা উন্মুক্ত করে দিতে হবে, কিন্তু সজাগ থাকতে হবে। বিগত সময়ে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার কোম্পানি টিকা এনেছে। ভারত কেন চুক্তির বরখেলাপ করল? ২০ লাখ মানুষ এক ডোজ টিকা পেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন।’

জাপার এমপি কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘চুরি-ডাকাতি করলে একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা যায়। কিন্তু আইন কেন নিজের হাতে তুলে নেওয়া হলো? কেন সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে এভাবে হেনস্তা করা হলো? এটা নিয়ে জাতিসংঘ, সারা পৃথিবী কথা বলল। আমাদের মুখটা কোথায় গেল? নিজেদের দুর্বলতা নিজেদের ঢাকতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘আসলে কথা বলে লাভ কী? কার কথা কে শোনে? আর আমাদের কথা কেউ বিশ্বাসও করে না। এজন্য কথা বলতেও চাই না।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘আপনি একজন সজ্জন ব্যক্তি। আপনার বাবা আমার সঙ্গে মন্ত্রী ছিলেন। আপনাকে আমি চিনি। অত্যন্ত ধনাঢ্য পরিবারের ছেলে আপনি। কিন্তু আপনার তো কর্তৃত্ব নেই, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যা হচ্ছে। হাসপাতালে অক্সিজেন নেই। এখন দরকার অক্সিজেন। সেটা না এনে আনা হচ্ছে এমআরআই, সিটি স্ক্যান মেশিন। পাঠানো হচ্ছে উপজেলায়। তারা সব সাজিয়ে রেখে দিয়েছে। চালাতে পারে না। লাখো-কোটি টাকা যাচ্ছে, কিন্তু জনগণ সেবা পাচ্ছে না।’

জাপার সংরক্ষিত আসনের সদস্য অধ্যাপিকা রওশন আরা মান্নান বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবজালরা অনিয়ম করছে রূপকথার গল্পের মতো। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এখন কিছুটা কমে এসেছে, কিন্তু তাদের থামানো যাচ্ছে না। এখানে অনেক মালেক, আবজালের ছড়াছড়ি। একজন নারী উপসচিবের কানাডাসহ তিনটি দেশে বাড়ি আছে। একজন নারী সাংবাদিক অন্যায় করলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে দেওয়া হলো না কেন? কেন তাকে ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন করা হলো?’ বিএনপির এমপি মোশাররফ হোসেন বলেন, একজন কর্মকর্তা সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের গলা চিপে ধরে হেনস্তা করেছেন, এটা হতে পারে না।

বিএনপির ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, স্বাস্থ্য খাতে অবহেলার মাশুল দিতে হচ্ছে। জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া উচিত ছিল। দক্ষিণ এশিয়ায় সব দেশে বরাদ্দ বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। ১০ মাসে স্বাস্থ্য খাতে এডিপির মাত্র ২৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। এখন আবার নতুন বরাদ্দ চাইছে। কেন ৭৫ শতাংশ অব্যবহূত রয়ে গেছে, তার জবাব স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দিতে হবে। রুমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার জেলায় জেলায় আইসিইউ স্থাপন করতে বলেছেন। কিন্তু দেড় বছরে মাত্র পাঁচটি জেলায় নতুন আইসিইউ স্থাপন করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এমপি-মন্ত্রী, ব্যবসায়ীরা অনেকে মনে করতেন, সর্দি-কাশি হলেও দেশে চিকিত্সা নিতে হবে না। করোনা দেখিয়েছে, দেশে চিকিত্সা ছাড়া উপায় নেই।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জবাব

সমালোচনার জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, স্বাস্থ্যসেবা একটি ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। দেড় বছর যাবত্ করোনা চলছে। স্বাস্থ্য বিভাগ সেবা দিয়ে যাচ্ছে। করোনা মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ওষুধের কোনো ঘাটতি হয়নি। অক্সিজেনের অভাব কখনোই হয়নি। আমেরিকায় যে চিকিত্সা, এখানেও একই চিকিত্সা হয়েছে। টিকা কার্যক্রম চলমান। এসব কারণে মৃত্যুর হার দেড় শতাংশ। পৃথিবীতে এই হার আড়াই শতাংশ।

চীন থেকে দেড় কোটি ডোজ টিকা

এদিকে, গতকাল সংসদে টেবিলে উপস্থাপিত প্রশ্নোত্তরে নেত্রকোনা-৩ আসনের এমপি অসীম কুমার উকিলের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সংসদকে জানান, চীন সরকার থেকে দেড় কোটি ডোজ করোনা ভাইরাসের টিকা ‘সিনোভ্যাক’ কেনার জন্য সরকার অনুমোদন দিয়েছে। শিগিগরই এই টিকা দেশে আনার প্রয়াস অব্যাহত আছে। মন্ত্রী জানান, চীন সরকার থেকে ৫ লাখ ডোজ টিকা উপহার এসেছে। এই টিকা ২৫ মে থেকে প্রয়োগ শুরু হয়েছে। আরো ৬ লাখ ডোজ অনুদান হিসেবে শিগিগরই পাওয়া যাবে।

২ কোটি ২০ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’

ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে

স্বাস্থ্য মন্ত্রী বলেছেন, একজন সুস্থ শিশু কেবল একটি পরিবারের জন্যই নয়, গোটা দেশের জন্যই সম্পদ। একটি পরিবারে একজন অন্ধ মানুষ থাকলে সেই পরিবারে আর্থিকসহ নানারকম কষ্ট ভোগ করতে হয়। বর্তমান সরকার যথাযথভাবে দেশের শিশুদের প্রতি বছর ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর ফলে দেশে বর্তমানে রাতকানা রোগ নির্মূল হয়েছে। এবছরও সরকার দেশব্যাপী ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।