আবার সহজলভ্য হতে পারে ‘সংকটাপন্ন’ পিয়ালী মাছ

মাছের নাম পিয়ালী। আকারে মলা মাছের চেয়ে কিছুটা বড়। মিঠা পানির অত্যন্ত সুস্বাদু এই মাছ একসময় যমুনা ও পদ্মায় প্রচুর পরিমাণে মিলত। কিন্তু পরিবেশগত বিপর্যয় ও অতিমাত্রায় আহরণের ফলে এই মাছ বর্তমানে ‘সংকটাপন্ন’ মাছের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাজারে সহজে এর দেখা মেলে না। তবে সুখবর হচ্ছে, বিলুপ্তপ্রায় এই মাছ আবার সহজলভ্য হবে বলে আশা করা যায়। কারণ, বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বগুড়া জেলার সান্তাহার প্লাবনভূমি উপকেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ সময়ের গবেষণায় প্রথমবারের মতো পিয়ালী মাছে কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উত্পাদন কৌশল উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছেন। ফলে এই মাছের পোনা প্রাপ্তি এখন সহজ হবে এবং তা চাষের আওতায় আনা যাবে। প্রজনন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের এ গবেষকদলে ছিলেন উপকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ডেভিট রিন্টু দাস, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান ও মালিহা খানম।

আইইউসিএন বাংলাদেশে-এর হিসাবমতে, দেশের ২৬০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ অর্থাত্ ৬৪ প্রজাতির মাছ ‘বিলুপ্তপ্রায়’। এর মধ্যে ৯টি অতিবিপন্ন, ৩০টি বিপন্ন ও ২৫টি সংকটাপন্ন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। সংকটাপন্ন মাছের তালিকায় ছিল পিয়ালীও। ফলে মাছটির প্রজননপ্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা শুরু করে বিএফআরআইয়ের বিজ্ঞানীরা।

বিএফআরআই সূত্র জানায়, সান্তাহার প্লাবনভূমি উপকেন্দ্রের সংশ্লিষ্টরা যমুনা, বাঙ্গালী ও আত্রাই নদীসহ বিভিন্ন উত্স থেকে পিয়ালী মাছের পোনা সংগ্রহ করে উপকেন্দ্রের পুকুরে তা নিবিড়ভাবে প্রতিপালন করে। এ সময় পিয়ালী মাছের খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করে সে অনুযায়ী তাদের খাদ্য সরবরাহ করা হয়। প্রাকৃতিক জলাশয়ে এরা মূলত প্লাঙ্কটন (একজাতীয় অতি ক্ষুদ্র জীবকণা) খেয়ে বেঁচে থাকে। এ প্রজাতির মাছ সাধারণত বর্ষাকালে অগভীর জলাশয়ে প্রজননে অংশ নিয়ে থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মে থেকে আগস্ট এবং ডিসেম্বর  থেকে জানুয়ারি মৌসুমে প্রজননক্ষম পরিপক্ব স্ত্রী মাছ পাওয়া যায় এবং জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে জলাশয়ে পিয়ালীর পোনার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এতে প্রমাণিত হয়, পিয়ালী মাছের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম হচ্ছে মে-আগস্ট এবং ডিসেম্বর-জানুয়ারি। একটি মা পিয়ালী মাছ ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ ডিম পাড়ে।

গবেষণায় আরো দেখা যায়, একটি পরিপক্ব স্ত্রী পিয়ালী মাছ ৩.৫ থেকে ৬ গ্রাম ওজনের হলেই প্রজনন উপযোগী হয়। প্রজনন উপযোগী পুরুষ পিয়ালী মাছ আকারে অপেক্ষাকৃত বড় (৪-৬ গ্রাম) হয়। ইনস্টিটিউটের চলমান গবেষণায় পাঁচ জোড়া পিয়ালী মাছকে চলতি জুন মাসে ১ :১.৫ অনুপাতে হরমোন প্রয়োগ করা হয়। হরমোন প্রয়োগের ছয় থেকে আট ঘণ্টা পর ডিম ছাড়ে এবং ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা পরে নিষিক্ত ডিম থেকে রেণু উত্পাদিত হয়। ডিম নিষিক্ত হওয়ার হার ছিল প্রায় ৭৬ ভাগ। উত্পাদিত রেণু বর্তমানে ইনস্টিটিউটের প্লাবনভূমি উপকেন্দ্রের হ্যাচারিতে যত্ন করা হচ্ছে।

গবেষক দলের প্রধান ড. ডেভিড রিন্টু দাস জানান, পিয়ালী মাছ দ্রুত বর্ধনশীল ও খেতে খুবই সুস্বাদু। এই মাছ আমিষ, চর্বি, ক্যালসিয়াম ও লৌহসমৃদ্ধ। প্রতি ১০০ গ্রাম পিয়ালী মাছে মেথিয়োনিন ৭৫০ মিলিগ্রাম, সিস্টিন ৪২০ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৪৩০ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৬৭০ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ১৫০ মিলিগ্রাম, জিংক ১২.৮ মিলিগ্রাম, আয়রন ২৫ মিলিগ্রাম, মেঙ্গানিজ ৮.২১ মিলিগ্রাম এবং ১.৪০ শতাংশ কপার রয়েছে, যা অন্যান্য অনেক দেশীয় ছোট মাছের চেয়ে অনেক বেশি। ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণে এই মাছ অত্যন্ত কার্যকর।

বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ ইত্তেফাককে বলেন, পিয়ালী সংকটাপন্ন মাছের তালিকায় ছিল। কিন্তু প্রজনন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে এখন সহজেই এই মাছ চাষ করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, চলতি বছর ইনস্টিটিউট ১০টি দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন কৌশল উদ্ভাবনের লক্ষ্যে গবেষণা কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ইনস্টিটিউট ইতিমধ্যে ঢেলা, বাতাসি, লইট্যা, ট্যাংরা, পুইয়া ও পিয়ালী মাছের প্রজনন কৌশল উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। শিগিগর আরো সাফল্য আসবে বলে তিনি আশা করছেন।