ইন্টার্ন ব্যাংকের এজেন্ট আত্মসাত্ করল তিতাসের ১০ কোটি টাকা

২০১৮ সাল থেকে রাজধানীর মিরপুরের ৬০ ফুট এলাকায় ‘ইন্টার্ন ব্যাংকিং অ্যান্ড কমার্স’ নামে একটি এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়। ঐ প্রতিষ্ঠানে এলাকার লোকজন তিতাস গ্যাসের বিল, পানি ও বিদ্যুতের বিল প্রদান করতেন। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ছিল ওমর ফারুক (৩২)। এলাকার লোকজন মাসের পর মাস বিল দিতেন। বুঝতেন যে তাদের বিল পরিশোধ হয়েছে। এদিকে তিতাসের কয়েক মাসের বিল বকেয়া হওয়ায় কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযানে নামে। লাইন বিচ্ছিন্ন করার সময় গ্রাহকেরা ব্যাংকে বিল জমা দেওয়ার রসিদ দেখান। তিতাস কর্তৃপক্ষ সেসব রসিদ যাচাই-বাছাই করে দেখে যে রসিদগুলো জাল। মিরপুরে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে ব্যাংকে জমা দেওয়া বিল আত্মসাত্ করেছে ‘ইন্টার্ন ব্যাংকিং অ্যান্ড কমার্স’।

জানা গেছে, এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের মালিক ওমর ফারুক ব্যাংকের ভুয়া সিল ও স্বাক্ষর দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করতেন এবং ঐ টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে জমা না দিয়ে নিজেই আত্মসাত্ করেন।

র্যাব জানায়, ওমর ফারুক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শুধু ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়নি, এর পাশাপাশি সে অটুট বন্ধন নামে এমএলএম কোম্পানির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাত্ করেছে এবং নব ক্যাশ নামের মোবাইল ব্যাংকিং খুলে অনেক মানুষের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। গতকাল রাজধানীর কাওরান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৪-এর অধিনায়ক পুলিশের অ্যাডিশনাল ডিআইজি মো. মোজাম্মেল হক জানান, রবিবার রাত ১টার দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকা থেকে ফারুককে গ্রেপ্তার করা হয়। গত জানুয়ারি মাসে মিরপুর এলাকায় তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ মাইকিং করে বকেয়া বিলের জন্য প্রায় দেড় হাজার গ্রাহকের গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রচারণা চালায়। মাইকিংয়ের পরপরই ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা প্রতারক ফারুকের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাস্তায় আন্দোলনে নেমে পড়ে। পরে গত ২৩ জানুয়ারি ‘ইন্টার্ন ব্যাংকিং অ্যান্ড কমার্স’সহ তিনটি অফিস তালাবদ্ধ করে ফারুকসহ তার অন্য সহযোগীরা আত্মগোপনে চলে যায়। এরপর ভুক্তভোগী এক গ্রাহক এ ব্যাপারে মিরপুর থানায় মামলা দায়ের করেন।

মো. মোজাম্মেল হক জানান, ওমর ফারুকের বাড়ি নোয়াখালী জেলার কবিরহাটের সাগরপুর এলাকায়। সে ২০০৯ সালে এসএসসি পাশ করে ২০১৪ সালে ঢাকায় চলে এসে মগবাজার এলাকায় একটি বিকাশের দোকানে চাকরি শুরু করে। ২০১৫ সালে মিরপুরের আহম্মেদনগর এলাকায় নিজেই বিকাশের ব্যবসা শুরু করে। প্রতারণার উদ্দেশ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে সে বিভিন্ন ব্যাংকে পাঁচটির বেশি একাউন্ট খোলে। পরে সে ২০১৮ সালে মিরপুর-২-এর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের ৬০ ফিট এলাকায় ‘ইন্টার্ন ব্যাংকিং অ্যান্ড কমার্স’ নামক এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। ওমর ফারুক তার এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলাকার গ্রাহকের গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করত।

তিনি আরো জানান, গত ২০১৮ সাল থেকে তিতাস গ্যাস, ওয়াসা ও ডেসকোর গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল সংগ্রহ করে জমা না দিয়ে বিলের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

এছাড়া সে ‘অটুট বন্ধন’ নামে একটি এমএলএম সমিতি প্রতিষ্ঠা করে সাধারণ জনগণকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকা আত্মসাত্ করে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় সে প্রতারণার উদ্দেশ্যে বিকাশ, নগদ এবং অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অনুরূপ বিল পরিশোধের জন্য ‘নব ক্যাশ’ নামক একটি সেবা চালু করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয়। সে এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন ছিল কি না—এ প্রশ্নের  উত্তরে র্যাব কর্মকর্তা জানান, সঠিক কাগজপত্র দিয়েই ‘ইন্টার্ন ব্যাংকিং অ্যান্ড কমার্স’ খোলা হয়েছিল। কিন্তু ফারুক ভুয়া সিল ও স্বাক্ষর দিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করত। পরে ঐ টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে সে নিজেই রেখে দিত। এ ঘটনার সঙ্গে ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা জড়িত আছে কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে তিতাস গ্যাসের কোনো গ্রাহক জড়িত আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেউ জড়িত থাকলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।